কে এই রমণী? —নর্তকী, বাররামা, বিদুষী। নগরীর সমস্ত পুরুষ অগ্নিলুব্ধ পতঙ্গের মতো ধাবমান। রাজপুরুষেরা, বাগ্মী, কবি, চিত্রকর, ভাস্কর ও দার্শনিকেরা। গৃহবধূ ও প্রণয়িনীরা হয়ে উঠেছে শঙ্কিত, এমনকি অন্য বাররামরাও।
গোধূলি সমাগত হতে-না-হতে চঞ্চলার গৃহে পুরুষেরা সমবেত হতে থাকে। সকলেই তার প্রণয়প্রার্থী, সকলেই তার কৃপাভিখারী। আর চঞ্চলার জন্মগ্রহণ গ্রামে হলেও নগরীতে যখন সে নীত হয়েছে তখন তাকে মনে হয় এক আশ্চর্য মৃণালে উদ্যত পঙ্কজের মতো। তার মুখের মণ্ডলে যেন বিলুপ্ত কোনো প্রাচীন নগরীর কারুকার্য খচিত; তার কেশদাম যেন নিশীথের অন্ধকারের দ্বারা রচিত; গাত্ৰবৰ্ণ কনকাভ : দেহ দীঘল ও তণ্বী; স্তন নিটোল, পরিপূর্ণ ও কোমল-কঠিন দুটি ফলের মতো; শ্রোণী নিবিড়, পরিপূর্ণ ও কোমল-কঠিন দুটি ফলের মতো; করাঙ্গুলি সদ্যজাত অগ্নিশিখ পর্বতের মতো; পদাঙ্গুলি রক্তশিখ সদ্যজাত পল্লবের মতো। চঞ্চলা এক শারীরিণী রমণী; কিন্তু শরীরসর্বস্ব নয়—তার হাস্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মেধার দ্যুতি; হয়তো গভীর নয় কিন্তু চারু তার বাচনভঙ্গি; কবিতা ও ভাস্কৰ্য, চিত্ৰকলা ও দর্শন-সমেত সব বিষয় সম্পর্কেই আছে তার প্রাথমিক জ্ঞান। সেজন্যে তার সঙ্গে আলাপের আবহ থাকে সচ্ছল বাতাসের মতো। আর সে, বাররামা, জানে বাক্যের সঙ্গে কি করে মেশাতে হয় কটাক্ষ, হর্ষের উদ্বেলতার সঙ্গে কি করে সংগত হয় নিতম্বের হিল্লোল। তার শরীর যেন একটি সংগীত; যেন একটি সোনালি পানপত্রের উত্থাপন; আর তার রতিকুশলতা বাদ্য-যন্ত্ৰে মৃদু-সমতল-তীব্ৰ-অতিতীব্র এইমতো ক্ৰমোচ্চলীলা সুদক্ষ করাঙ্গুলির!
চঞ্চলা একটু স্বতন্ত্র। সাধারণ স্নানাগারে সে কখনো যায় না, কেমন যেন তার রুচি হয় না সাধারণ্যে নগ্ন হতে। চঞ্চলার খ্যাতি ও পুরুষমহলে প্রতিপত্তি ও আকর্ষণ হয়তো এত বেশি এজন্য যে বাররমণী হলেও তাকে সাধারণ্যে নগ্ন দেখা যায় না। বছরে একবারই, নগরীর বাৎসরিক উৎসবে মন্দিরে প্রণতি সমাপন করে সে আমূল নগ্ন হয়ে সমুদ্রে স্নান করতে যায়। বৎসরে ঐ একবারই তাকে নগরবাসী নগ্ন দেখতে পায়। কিন্তু উৎসবের উন্মাদনায় সবাই এত ব্যস্ত থাকে তখন যে, নগ্নিকা চঞ্চলার দিকে আলাদা দৃষ্টিপাতের অবসর থাকে না করো। কেবল হাজার হাজার নরনারীর ভিতরে লুকিয়ে এক রাজপুরুষ পৃথিবীর তীব্রতম ক্ষুধা নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। রাজপুরুষ চঞ্চলার এক প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক। গত তিন বছরে সে এই উৎসবের দিনটিতে চঞ্চলাকে দেখার জন্যে ভিড়ের ভিতরে লুকিয়ে তাকে। তারপর স্থালী হাতে আমূল নগ্ন চঞ্চলা যখন মন্দিরদ্বার থেকে বহির্গত হয়ে একটি দীপ্র ঘোটকীর মতো সমুদ্রের উদ্দেশে চলতে থাকে, তখন জনতার মধ্যে থেকে তাকে অনুসরণ করে এক রাজপুরুষ। তাকে সমুদ্র অবধি অনুসরণ করে রাজপুরুষ, নীল সিন্ধুজলে রূপসীর অবতরণ অবধি, এবং তারও পর তার স্নান সমাপন অবধি তার ক্ষুৎকাতর চক্ষুদ্বয় জ্বলন্ত জাগ্রত থাকে। এই রাজপুরুষ দীর্ঘাঙ্গ ও সুদৰ্শন। অথচ কত তুচ্ছ নাগরিক চঞ্চলার হৃদয় ও শরীরের দখল পেয়েছে, কিন্তু এই রাজপুরুষকে চঞ্চলা কি-এক অজ্ঞাত কারণে প্রত্যাখ্যানের পর প্রত্যাখ্যান করেছে। কতদিন চঞ্চলাকে এক-পলক দেখার আশায় তার বাড়িতে গিয়ে বসে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু আশ্চর্য, চঞ্চলা তাকে বলতে গেলে একরকম অপমানই করেছে। বেচারা রাজপুরুষ তাই তাকে নগ্নিকা দেখার আশায় সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে।
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চঞ্চলার গৃহে এই নগরীর শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সমাবেশ। রাজপুরুষ, কবি, বাগ্মী, ভাস্কর, চিত্রকর। বাররমণী সে, তার গৃহদ্বার সকলের জন্যে উন্মুক্ত, কিন্তু হৃদয়দ্বার নয়। এই নগরীতেই এমন রূপসী আছে যে চঞ্চলার চেয়ে সুন্দরী, এমন রমণী আছে যে চঞ্চলার চেয়ে মেধাবিণী, কিন্তু রূপ এবং মেধার এমন সমন্বয় কি আছে আর? নেই। চঞ্চলার আছে সেই ব্যক্তিত্বের ব্যবহার, যা নেই স্তননিতম্বসর্বস্ব অন্য বাররমণীদের। তাই তার উদার নিমন্ত্রণের মধ্যেও একটি নির্বাচন আছে। আর-যে নারীর ব্যক্তিত্ব আছে, নির্বাচন আছে, সে আহ্বান করে নিয়ে আসে দ্বন্দ্ব, বিরোধ, প্রতিদ্বন্দ্ব। অর্থাৎ ঘটনা, নিস্তাপ সমতল জীবনযাপন নয়-পতনে-উত্থানে দোলায়িত ঘটনা। এবং সেরকম একটি ঘটনাই সংঘটিত হলো সেদিন।