সেদিন সূর্য অস্ত যেতে না-যেতে প্ৰদীপ প্ৰজ্বলিত হতে-না-হতে চঞ্চলার গৃহে উপস্থিত হয় কবি। কবি স্বভাবই ঈষৎ তীব্ৰ অস্থির ও ধৈর্যহীন। যখন সে উপস্থিত হলো, তখনও চঞ্চলার সান্ধ্যকালীন স্নান ও প্রসাধন সাঙ্গ হয়নি। কবি সানন্দে বসে বসে পা নাচায়।
সম্প্রসাধন সম্পন্ন করে ভিতর থেকে অনেকক্ষণ পরে চঞ্চলা যখন বেরিয়ে এল হাস্যোজুল মুখে, তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ, রীতিমতো রাত্রি নেমেছে। বলল—কি ব্যাপার, কবি আজ এত তাড়াতাড়ি?
কবি সে কথার উত্তর না-দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে—আরে, এ যে দেখছি কক্ষের ভিতরেই চন্দ্রোদয়। সত্যি চঞ্চলা, তুমি আজ আচঞ্চল দ্বিতীয় চন্দ্রের মতো দীপ্যমান। আমি কিছু কবিতা রচনা করেছি, কিন্তু মনে হচ্ছে ঈশ্বর-রচিত সৃষ্টির কাছে সেসব তুচ্ছ।
হয়েছে, খুব হয়েছে! আঁখিজাদু হেনে বলল যুবতী ।
কবি রীতিমতো নাটকী আবেদন সৃষ্টি করে—আহা আজ রজনীতে না জানি সে কোন ভাগ্যবান পুরুষ এই রূপসরোবরে স্নান করবে? -ওহ, খুব হিংসা হচ্ছে, না–চঞ্চলা একটি ফোয়ারার মতো কলহাস্য করে ওঠে। তারপর ফোয়ারা শমিত করে বলে—কেন, চন্দ্ররশ্মি এই কবির উপরে কি এসে পড়েনি কোনো দিন?
—তা পড়েছে। তা পড়েছে। কবির সপ্রতিভতা একতিল ভ্ৰষ্ট হয় না। কিন্তু—সেসব তো মনে হয় কোন পূর্বজন্মের কথা। এত সুদূর অতীতে বিষয় বলে মনে হয়, যার অর্ধেক স্মৃতির ভিতরে প্রবিষ্ট বাকি অর্ধেক স্বপ্নের অংশ। আর তুমি, চঞ্চলা, তোমাকে মনে হয় সাধারণ নারী নও তুমি। তুমি দেবী, তুমি ভিনাস, এইমাত্র সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়ে এলে, তোমার কেশরাশি এখনো সিক্ত, তোমার শরীর এখনো নীল লবণাম্বুজলের স্মরণে শীতল, তোমার আননে এখনো লিপ্ত হয়ে আছে দুএককণা সমুদ্রশীকর, দেবী তুমি, সমুদ্রউত্থিত ভিনাস তুমি—
কবির স্ত্ৰোত্র যখন এইভাবে অবিরলধারে নিক্ৰান্ত হচ্ছে, আর কানের দুল বিলকিয়ে মাথা ঈষৎ কাৎ করে সহাস্যে আশ্চর্য এক ভঙ্গিতে এই স্তোত্রপাঠ শ্ৰবণ করছে চঞ্চল, কেননা বাধা দেওয়া বৃথা, কেননা বাধা পেলে কবির বচন আরো উদ্বেলিত হয়ে উঠবে।—ঠিক সেই সময় কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে ভাস্কর। দীর্ঘ, বলশালী, সুষম শরীর সে নিজেই এক ব্রোঞ্জ ও পাথরের গড়া ভাস্কর্যের তুল্য।
কক্ষমধ্যে প্রবেশ করেই সে কবিকণ্ঠ নিঃসৃত স্তব শুনতে পেল। হাস্যমুখে সে তাকে শায় দ্যায়—ঠিক বলেছ, কবি। প্রকৃত কবিদৃষ্টি আছে তোমার। আমি ক-দিন থেকে ভাবছিলাম চঞ্চলাকে মডেল করে ভিনাসের একটি মূর্তি রচনা করা যায় কিনা। এখন নিশ্চিত হলাম। দ্বিধামুক্ত এখন কাজে নেমে যাব। কবির অনুমোদন পাওয়া গেছে অজ্ঞাতসারেই।
—বাহ! চমৎকার! কংকনঝংকারে চঞ্চলা স্বনিত-ক্কণিত হয়ে উঠল—শুড়ির সাক্ষী মাতাল এসে গেছে।
ভাস্কর আরাম করে বসে একটি কেদারায়। কানেও নেয় না চঞ্চলার কথা। বলে—আমি আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু করতে চাই। কাল কি তোমার সময় হবে, চঞ্চলা? আসতে পারবে আমার আলয়ে?
—উহ! তর সইছে না আর কারো! চঞ্চলা কটাক্ষ হানে। এই সময় চিত্রকর, গায়ক, বাদক, বাগ্মী প্রভৃতির একটি দল এসে উপস্থিত হয়। এদের মধ্যে বাগ্মী বয়স্ক, তার একমাথা শ্বেতশুভ্র চুলশাদা। পতাকার মতো উড্ডীন, কিন্তু তার মুখাবয়ব তারুণ্যে প্রদীপ্ত। আর দীর্ঘ কৃশকায় নবযুবকটি গায়ক, এই আসরে সে-ই সবচেয়ে অল্পবয়স্ক,—চঞ্চলার গৃহে আজই সে প্রথম এল। অন্যেরা চঞ্চলার পুরাতন প্রণয়ী ও উমেদার। এরা সব এক আসর থেকে একসঙ্গে এখানে চলে এসেছে।
সম্ভাষণ বিনিময় পর সবাই উপবেশন করল। চঞ্চলা ভিতরে গেল একটুক্ষণের জন্য। চঞ্চলার উদ্দেশে তার স্তব ব্যাহত হওয়ায়, এবং একটু বেশি ভিড় হয়ে যাওয়ায়, কবি ভিতরে ভিতরে বেশ ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ে। বেচারা নবীন যুবা গায়কটি তার ব্যঙ্গবাণের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
চঞ্চলা ফিরে আসে একটু পরে। তার পিছু পিছু কয়েকজন দাস-দাসী প্রচুর সুখাদ্য ও সুরা নিয়ে আসে।
তারপর চলে পান, ভোজন, হাস্যরসালাপ৷ চঞ্চলার কণ্ঠে গীত হয় মধুস্রাবী একটি গান। এইসব যখন চলছে, তখন একজন দাস এসে সংবাদ দ্যায়, কে একজন বার্তাবাহক দেখা করতে চাচ্ছে।
—বার্তটি নিয়ে এলে হয়। কেউ একজন বলল।— দাস উত্তর দ্যায়—না, তিনি নিজের হাতে দেবেন, বললেন।—
কবিই বলে—এখানে আসতে বলো তাকে।
কিছুক্ষণ পরেই দাসের সঙ্গে বার্তাবাহকটি এসে উপস্থিত হয় উৎকণ্ঠিত সবার সম্মুখে। অভিবাদন করে সে একটি পত্ৰ চঞ্চলার হাতে অৰ্পণ করে। পত্রটি পাঠ করতে করতে চঞ্চলার মুখবর্ণ প্রথমে রক্তিম পরে শাদা হয়ে যায়। কবি দ্রুত সেটি নিজের হাতে গ্ৰহণ করে। তারপর বার্তাবাহকের দিকে ফিরে তাকালে সে অভিবাদন করে প্রস্থান করে।
পত্রটি পাঠ করে কবি গম্ভীর হয়ে যায়। তারপর গভীর অথচ উত্তেজিত কণ্ঠে কিন্তু যথাসম্ভব আত্মসংবরণ করে বলে—এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তারা সবাই চঞ্চলার ঘনিষ্ঠ । তাই এটি চঞ্চলার প্রতি একটি ব্যক্তিগত পত্র হলেও আমরা সবাই এর অংশভাগী । সেজন্যেই আমি এর সারাৎসার আপনাদের জানাতে চাই । তারপর আমাদের যথাকতব্য স্থির করতে হবে। পত্রটি এসেছে আমাদের বিচারসভা থেকে। এতে বলা হয়েছে, চঞ্চলা এই নগরের পুরুষদের বিপথগামী করছে, তাদের চরিত্র নষ্ট করছে, এ-জন্যে নগরের গৃহবধূরা বোধ করছে বিপন্ন, এবং তারা মহান বিচারকবৃন্দের কাছে অভিযোগ পেশ করছে এর বিহিত করার জন্যে। নগরের বিচারসভা এই বিচারের ভার গ্রহণ করেছে। তদনুযায়ী চঞ্চলাকে আগামীকাল বিচারসভায় উপস্থিত থাকতে হবে। প্রধান বিচারপতির স্বাক্ষরে এই পত্র প্রেরিত হয়েছে।
এই বিবরণ শুনে প্রত্যেকের মুখ ব্যথিত, ক্লিষ্ট ও ত্ৰাসিত হয়ে উঠল। বিচারসভার আহ্বানের অর্থ কি, সবাই জানে। নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড, অথবা নির্বাসন, অথবা অনুরূপ কোনো কঠিন শাস্তি। মুহূর্তে সমস্ত আনন্দ ও আলো নির্বাপিত হয়ে সারা ঘরে নেমে এল হিম নীরবতা।
নীরবতা ভঙ্গ করে চঞ্চলাই প্ৰথম কথা বলল। বলল—এ কার কীর্তি আমি জানি।
—কার? একসঙ্গে চীৎকার করে উঠল। সকলে।
—এ সেই রাজপুরুষের কীর্তি যাকে আপনারা চেনেন, যিনি এখানে আসেন, কিন্তু দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর আমার প্রণয় প্রার্থনা করেও সম্ভাষণ বিনিময় পর সবাই উপবেশন এখানে আসবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে। ভাস্কর ভাবছিল, চঞ্চলার একটি প্রতিমূর্তি রচনার যে-আকাঙ্ক্ষা ছিল তার, তা আর বুঝি পূর্ণ হলো না। কবি ভাবল, শেষ পর্যন্ত কি হয় দেখাই যাক। একটা কি আলোকসম্ভব কিছু ঘটতে পারে না!