প্রিয় উদয়ভানু

এক

অমর মিত্র

৬১ বার পঠিত

বইয়ের জন্য বাড়ি ছেড়ে যেতে হবে। বই থাকবে না হয় মানুষ থাকবে। বিমল সরকারের অবস্থা হয়েছে এই। বিমলের মেয়ের বিয়ে হয়েছে সদ্য। আর এক মেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, তার বিয়ে দিতে হবে বছর তিনের মধ্যে। বিমলের সাতকেলের পুরোন ভাড়াটে ফ্ল্যাটের কোনো ছিরিছাদ নেই এমনিতে, তিনটি ঘর বড় বড়, সরু প্যাসেজ, কিচেন বা রান্না ঘর আর একটা স্টোর রুম বা ভাঁড়ার ঘর, কলতলা, স্নানঘর ও টয়লেট আলাদা আলাদা। এই ফ্ল্যাট বিমলের বাবা ১৯৫৭ সালে ভাড়া নিয়েছিলেন, তারপর ভাড়া বেড়ে বেড়ে হয়েছে সাড়ে পাঁচশো। বাড়ি ভাড়ার চারগুন ইলেকট্রিক বিল।

কাছেই টালার জলাধার থাকায় ২৪ ঘন্টা জল। জায়গাটা খুব শান্ত। এখানে কলকাতার আর সব জায়গার মতো পুরোন বাড়ি ভেঙে বহুতল উঠতে আরম্ভ করেছে সবে। কিন্তু একটি দুটি। সাবেক কলকাতার পুরসভায় এই জায়গা ছিল না, প্রবেশ করেছিল ১৯২৫-এ। সাবেক কলকাতা ছিল চিৎপুর খালের ওপার পর্যন্ত। এই সব বিমল শুনত তার বাড়িওয়ালা সত্যেন লাহার মুখে। তাঁরা কলকাতা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের কাছ থেকে সস্তায় জমি কিনে ১৯৪৬ নাগাদ এই দুটি বাড়ি করেন। একটি তাঁদের থাকার, অন্যটি ভাড়া দেওয়ার জন্য আটটি ফ্ল্যাটে চারতলা। তখন ভারত ভাগ হচ্ছে। পাকিস্তান প্রস্তাব পাশ। পূর্ব বাংলা থেকে মানুষ আসতে আরম্ভ করেছে ধীরে ধীরে। কলকাতায় ভাড়াটে বাড়ির চাহিদা বাড়ছে। বিশ্বযুদ্ধ তো শেষ। যারা জাপানি বোমার ভয়ে এই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল তারা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে।

চোদ্দ ফুট উচু উচু সিলিং, চোদ্দ ইঞ্চি মোটা দেওয়াল, সেগুন কাঠের দরজা, বড় বড় জানালা, খড়খড়িওয়ালা পাল্লা, এই বাড়ি খুব পোক্ত। আর বিমল সরকারের ফ্ল্যাটের পেছনে তিরিশ ফুট অবধি খোলা, তারপর প্রাচীর তারপর দক্ষিণ খোলা জৈন মন্দির। দোতলার বিমলের মনে কী বিমল আনন্দ। কী হাওয়া এই গ্রীষ্মের দিনে। বঙ্গোপসাগর হাওয়া পাঠিয়েই যায়। বিমল তো থাকে দোতলায়। তার ঘর থেকে জৈন মন্দির দেখা যায়। মন্দিরের ঘন্টা শোনা যায়। আর শোনা যায় মন্দির পার হয়ে ট্রাম রাস্তা, চিৎপুর রেল ইয়ারডের সেই কাছিমের পিঠের মতো উচু হয়ে থাকা ব্রিজের আরম্ভের দিক থেকে ভেসে আসা আজান ধ্বনি। ভোর চারটের আজান বিমল শুনতে পায় ঘুমের ঘোরে। শুনতে শুনতেই ঘুমোয় আবার। তার মশারি তখন ফুলে ওঠে শেষরাতের হাওয়ায়। যদি আকাশে চাঁদ থাকে ঈষৎ পশ্চিম ঘেঁষে, তার আলো এসে পড়ে বিমলের বুকে। বিমল একা শোয়। বয়স পঞ্চান্ন। তার জন্ম এই ফ্ল্যাটে। বিমল এখন একা শুতে ভালবাসে। এই ঘরে এই সিঙ্গল খাটে তার বাবা কমল সরকার কত দীর্ঘদিন ঘুমিয়েছেন। বাবা বছর পঞ্চাশের পর থেকে এই ঘরে। এই খটেই তাঁর প্রয়াণ। বিমলরা চার ভাই। বাকি তিনজন তিন শহরে। বিমল একা পড়ে আছে এই শহরে। খোলা জানালা দিয়ে গ্রীষ্মের মেঘমুক্ত নির্মল আকাশ চাঁদের আলো দখিনা বাতাস আয়ু বর্দ্ধক, বাবা বেঁচেছিলেন ৮৯ বছর। বিমল জানে যৌবন যখন অস্তাচলে ঢলতে আরম্ভ করে, তখনি আয়ুর কথা ভাবতে হয়। আয়ু যাতে বাড়ে সেই সাধনা করে যেতে হয়। তার মনে হয়, এই ঘর সারারাত ধরে যে অক্সিজেন জোগায় তাকে তা তাকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখবে। একটা বয়সে একা হয়ে যেতে ভাল লাগে। সে ভাল লাগা থেকে সে এখানে। তার এই ঘরে বই আর সে আছে। বিমল সরকার লেখে। সে খারাপ নাম করেনি। কিন্তু তেমন নামও নয় তার যে একডাকে লোকে চিনবে। ১৯-২০র যুবতীরা তার লেখা পড়ে তার কাছে এসে গুনগুন করবে, বিমল এমন লেখেনা বা লিখতে পারে না। সে অমন এক লেখকের সঙ্গে একবার কোন এক সভায় গিয়েছিল কলকাতার বাইরে, বুঝেছিল তার দর কত। সেই জনপ্রিয় লেখক যখন সভায় তাঁর বক্তৃতার কালে হিসেব দিতে আরম্ভ করলেন তাঁর বই কত বিক্রি হয়, তখন বিমল পড়েছিল বিপদে। সাহিত্যের আলোচনা সভায় তাদের বলার কথা উপন্যাস রচনার কথা। উপন্যাস কী ভাবে দীর্ঘদিন ধরে লেখেন একজন লেখক। সেই কথা বলতে গিয়ে জনপ্রিয় লেখক তাঁর পুস্তক বিক্রয়ের পরিসংখ্যান দিতে বিমল আরম্ভ করেছিল তার বই কোনোটারই এডিশন হয় না বছর চার পাঁচে, এই বচনে। সে খুবই গর্বিত তার সহযাত্রী লেখকের বই এত বিক্রি হয়ে থাকে তা জেনে। বই কারা কেনে তা সে জানে না। আশ্চর্য লাগে তবুও কেউ কেউ কেনেন, দূর থেকে চিঠি লেখেন। এইটিই তার পাওয়া। এতে সে খুশি। তার ধ্যান হলো আর একটি লেখা লিখতে পারা যা আগের লেখাকে অতিক্রম করে যাবে। সে পুরোন লেখাকে মনে রাখে না। পুরোন উপন্যাস বা গল্পকে আর ফিরে দ্যাখে না। বিমলের কথার পর অনেকে এসে তার সঙ্গে আলাপ করেছিল। তার বইয়ের খবর নিয়েছিল। এই সব কতদিন আগের কথা। বিমল পুরোন বইয়ের কথা ভাবে না। নতুন বই নিয়ে তার যত আগ্রহ। কিন্তু কদিন ধরে তার মনে হচ্ছে পুরোন বইয়ের মতো কেউ কেউ তো মনে রাখে। গত পরশু তার কাছে একটি চিঠি এসেছে তার প্রথম বই ‘মহাত্মা গান্ধীর দেশ’ নিয়ে। সেই কতকাল আগে লেখা বইটি। ১৯৭৮-এর বন্যার বছরে তার প্রথম বই প্রকাশিত হয়। ১১টি গল্পের এক সংকলন। তখন তার ২৫ বছর বয়স। সে লিখছে বছর পাঁচ। সে পাঁচ বছরে লেখা গল্প থেকে বেছে এগারটি গল্পকে নিয়ে বইটি বের করেছিল। তার এক অগ্রজ বন্ধু সম্পাদক বইটি প্রকাশের সব দায়িত্ব নিয়েছিল।

পৃথিবীর সব জায়গার পরিবর্তন হলেও বিমলের এই জায়গার তেমন পরিবর্তন হয়নি। বিমল আছে বেশ। ভাড়াটে আইনে ৫৬ বছর রয়েছে, আরো ৫৬ বছর রয়ে যাবে। এই নিরাপত্তায় বিমল সরকারের কোথাও যাওয়া হয়নি এই বাড়ি ছেড়ে। এখন একটি কো-অপারেটিভ ফ্ল্যাটের মালিক হতে যাচ্ছে, যার ভিত অবধি উঠেছে সবে। বিমলের বউ শুভ্রা বলেছে সে এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যাবে না। নিউ টাউনে গেলে তার ভয় করবে। ওসব জায়গায় বেড়াতে যাওয়া যায়, শপিং করতে যাওয়া যায় কিন্তু ওখানে বাস করতে গেলে তার ঘুম হবে না। সবসময় মনে হবে বেড়াতে এসেছে বেড়াতে এসেছে। তার নিজের বাড়িতে ফিরতে হবে ফিরতে হবে। কথাটা বলেছে তাদের প্রতিবেশি চন্দন সাহার বউ কল্যানী। তারাও কো-অপারেটিভ ফ্ল্যাট করেছে নিউ-টাউনে। সে বাড়ি অ্যাকশন এরিয়া-১ এ। তাদের গৃহ প্রবেশ হয়ে গেছে। সে মাঝে মাঝে যায়। ফিরে এসে ওই কথা বলে। বিমল সরকারের বউ শুভ্রা সেই কথাই বলে যাচ্ছে এখন থেকে। রাম না হতে রামায়ণ। সবে ফাউন্ডেশন হচ্ছে লোহা বাঁধাই হয়ে আর সিমেন্ট ঢালাই করে। আগে উঠুক ফ্ল্যাট, তারপর বোঝা যাবে। শুভ্রা আসলে এই জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। এই পুরোন ফ্ল্যাটে সেই তিরিশ বছর আগে বউ হয়ে এসে, এই ফ্ল্যাটকেই তার নিজের বাড়ি বলে মনে করে। এই জীবনে বিমল সরকার কখানা বই লিখেছে আর প্রায় কিছুই করেনি। বিমলের গাড়ি নেই, বাড়ি নেই, মোটা ব্যাংক ব্যালেন্স নেই। ছিল একটি সরকারী চাকরি। অবসর নিয়ে পেনশন ভোগী আর সুদখোর হয়েছে। সে ইহজীবনে আর একটি কাজ করেছিল, যখন তার ৪৫-৪৬, এক টুকরো জমি কিনেছিল। কোথায়, না কলকাতা থেকে বেশ দূরে রেললাইনের ধারে। স্টেশন থেকে সাত মিনিট, হাসপাতাল, বাজার, শপিং –এর সুবিধা যুক্ত এক নতুন নগরী। বিমল এখন বলে শ্মশানও ছিল কাছে মনে হয়। সেই জমিতে প্রায়ই যেত বিমল ন্সপরিবারে। ধু ধু মাঠে একটি দুটি বাড়ি হচ্ছে। স্টেশন থেকে অটোয় দশ মিনিট। রাস্তা খুব খারাপ। কয়েকবার গিয়ে ফাঁকা মাঠের হাওয়া খেয়ে বাড়ি ফিরে শুভ্রা বলেছিল, হবে না।

কী হবে না?

জমি বেচে দাও, ওই জায়গা কস্মিনকালেও ডেভেলপড হবে না।

আমাদের তো জমি নেই।

না থাক, থাকতে হবে না, আমি এ জায়গা ছেড়ে যাব না, ওখনে গেলে ভয়েই মরে যাব, আমার দুটো মেয়ে বড় হচ্ছে।

জমি হুট করে বেচে দিল বিমল তার অফিসের ক্ষীরোদ রায়কে। তিনি নাকি রিটায়ার করে ওখানে বাড়ি করে সেই বাড়িতে দেহ ত্যাগ করেছেন। ক্ষীরোদ রায়ের মৃত্যু সংবাদ তার কাছে এসেছিল বছর চার আগে। ক্ষীরোদ রায় অবসর নিয়েছিলেন বছর দশ। বাড়ি করতে দেড় বছর। মানে লোকটা বছর চার সেই বাড়ি ভোগ করেছিল। সব শুনে শুভ্রা বলেছিল, অলক্ষুণে জায়গা। কী দরকার ছিল ওখেনে বাড়ি করা, কী করে মারা গেল?

হার্ট অ্যাটাকে।

না, অত রাতে কোথায় নিয়ে যাবে, গাড়ি কোথায় পাবে, আনতে হলে তো সেই বাইপাশের ধারে বেসরকারী হাসপাতাল, ফতুর করে মরে যেত। ক্ষোভে বলেছিল বিমল।

শুভ্রা বলেছিল, ভয়েই মরে গেছে, আমরা বুদ্ধির কাজ করেছি।

বিমলের মনে হয়েছিল সে বুদ্ধির কাজের জন্য ক্ষীরোদ রায় বেঘোরে প্রাণ দিল, সারাজীবন কলকাতা শহরে থেকে শেষ বয়সে নিজের একটা বাড়ি করার বাসনা জেগেছিল ক্ষীরোদের মনে। আর সেই বাসনা উসকে দিয়েছিল বিমল সরকার। সে তার জমি নিয়ে কত কথা শুনিয়েছিল। অবসর জীবন যাপনের আদর্শ জায়গা। ক্ষীরোদ রায়ের একটি মেয়ে। সে বিয়ের পর থাকে উলুবেড়ে। উলুবেড়ে থেকে সে ঢোল গোবিন্দপুর পৌঁছনো আর দিল্লি থেকে বাই এয়ার কলকাতা পৌঁছন একই ব্যাপার, বরং পরেরটা অনেক সুবিধের। মেয়ে এসে বাবাকে জীবিত দ্যাখেনি। পরে বিমল শুনেছিল ক্ষীরোদের মেয়ে সব দোষ তার উপর চাপিয়েছিল। বিমল সরকার মশায়ই তার বাবার ভিতরে জমি আর বাড়ির লোভ চাগিয়ে দিয়েছিল। নাহলে হাওড়ার দিকে ফ্ল্যাট দেখা যেত। বাবা বাগান করবে, গাছের এম খাবে এই লোভে চারকাঠা কিনে মরেই গেল।

বিমলের এক এক সময় মনে হয় ঘুরতে ঘুরতে চলে যায় সেই গোবিন্দপুর। গিয়ে দেখে আসে তার নিজের কেনা আর বেচা জমিতে কেমন সংসার পাতিয়ে বসেছে ক্ষীরোদের মেয়ে। বাবার মৃত্যুর জন্য বিমল সরকার আঙ্কেলকে দায়ী করেও, এত সব বলেও নাকি বাবার রেখে যাওয়া বাড়ির দখল নিয়েছে নিজের স্বামী পুত্র নিয়ে। তার হাজব্যান্ড সরকারী চাকুরে, বদলি নিয়ে কাছাকাছি চলে এসেছে। বিক্রির কথা নাকি বলেছিলেন ক্ষীরোদের বিধবা বউ। তিনি সেই রাতে বুকের যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা স্বামীর মৃত্যু দেখেছিলেন অসহায় হয়ে। আশপাশের লোক এসেছিল, কিন্তু গাড়ি কোথায়? অটো একটা পাওয়া গিয়েছিল বটে, কিন্তু অনেকদূর বাই-পাস হাসপাতাল। আর একটা অটো রিকশায় করে কে নিয়ে যাবে ক্ষীরোদ রায়কে? ক্ষীরোদের বউ কি একা পারবেন? কে যাবে সঙ্গে? অটো ওয়ালা বলেছিল, ফরশা হোক, সে ট্যাক্সি ডেকে দেবে। এখন ট্যাক্সিওয়ালার মোবাইল বন্ধ। সেই ভোরেই ক্ষীরোদ চলে যান।

ক্ষীরোদের মেয়ে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কিনেছে। মাঝরাতের বিপদের জন্য। জায়গাটা খুব ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। বিমল কথাটা তার বউ শুভ্রাকে বলতে, সে বলল, গিয়ে কী হবে, কী করবে গিয়ে, ওখানে কি আবার জমি কিনবে?