অনেক দিন পর বাড়ি ফিরে এলে সবকিছু কেমন যেন অচেনা আর দূরের মনে হয়! কত দিন পর এই বাড়ি ফেরা! না, বাড়ি কোথায়, এ তো বড় ভাইয়ের কেনা শহুরে অ্যাপার্টমেন্ট— সুসজ্জিত, পরিপাটি, কিন্তু আমার অচেনা— কোনো সম্পর্কই নেই আমার সঙ্গে। আমার যা-কিছু সম্পর্ক, যা-কিছু স্মৃতি, তার সবই রয়ে গেছে উদাসপুরে। সেখানে আর ফেরা হয়নি, হবে না কোনো দিন। তবু একে হয়তো বাড়ি ফেরাই বলবে সবাই, অন্তত আপনজনের কাছে ফেরা তো বটেই। আপনজন বলতে ওই পাগল বোন বুলু, ভাই মামুন, আর তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, বহুদিনের বিচ্ছিন্নতায় যাদের সঙ্গে একটা অচেনা দেয়াল তৈরি হয়েছে। কত বদলে গেছে সব! এই ছেলেমেয়েগুলোকে ছোট রেখে গিয়েছিলাম, এখন সব বড় হয়ে গেছে! ভাই-ভাবীর চেহারায় বয়সের ছাপ—চুলে পাক ধরেছে দুজনেরই। সেই মিষ্টি ভাবী, পাকা চুলে তাকে কেমন অচেনা লাগে। বাড়ি থেকে যখন চলে গিয়েছিলাম, আর কোনো দিন ফিরব না এমন সংকল্প করেই, তখনো ভাবী নতুন বউয়ের মতো মিষ্টি, আকর্ষণীয়। আর কী যে মধুর ছিল আমাদের সম্পর্কগুলো! দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে ভরা, মমতা আর ভালোবাসায় সিক্ত। এখন সবকিছুতে ধুলো জমেছে, এই কদিনে ভাবীর সঙ্গে কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোনো কথাই হয়নি। খাওয়ার সময় স্নেহময়ী হয়ে বসে থাকে বটে—ভাবীর এই স্বভাবটা মায়ের মতো, কিন্তু কোনো কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞেসও করে না—এত দিন কোথায় ছিলাম, কেমন ছিলাম, কেনই বা আবার ফিরে এলাম, আবার উধাও হয়ে যাওয়ার মতলব আছে কি না! মা থাকলে হয়তো জিজ্ঞেস করত। যখন গিয়েছিলাম, মা বেঁচে ছিল। সেদিনের কথা আজও খুব মনে পড়ে। মা ঘুমিয়েছিল আর আমি তার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলাম। মা জানতেও পারেনি, কিন্তু আমি জানতাম—ওটাই আমার শেষ দেখা। ওই পবিত্র দুঃখী মুখটি আজকাল খুব দেখতে ইচ্ছে করে। একজন মা কি তার সন্তানকে কখনো শেষ বিদায় জানাতে পারে! আমার মা একাধিকবার সেই কাজটিই করেছে—সেই যুদ্ধের সময়, যখন প্রতিটি যাওয়াই ছিল শেষবারের মতো যাওয়া, আর কখনো না ফেরার সম্ভাবনাটাই যখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। আবার যখন লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখা করতে আসতাম, এমনভাবে আদর করত, যেন ওটাই শেষ আদর, আর কখনো সন্তানকে ফিরে পাওয়া হবে না তার। সেসব কথা এখনকার ছেলেমেয়েরা বিশ্বাসই করতে পারবে না, ভাববে—গালগল্প করছি, রূপকথা শোনাচ্ছি। হ্যাঁ, রূপকথার মতোই ছিল সময়টি। একদল সুসজ্জিত দৈত্যের সঙ্গে যুদ্ধে নেমেছিল যারা, তাদের কেউ রাজপুত্র ছিল না, ছিল কৃষকপুত্র। তাদের শিরস্ত্রাণ ছিল না, হাতে অস্ত্র ছিল না, ছিল ধুলোর টুপি—তারা সেগুলো দিয়েই দৈত্যদের পরাজিত করেছিল। এ এক ভীষণ গাঁজাখুড়ি রূপকথা ছাড়া আর কী-ই বা মনে হবে! তো শেষবার যখন বিদায় নিলাম, তখন আর বলিনি, মা জানতেও পারেনি আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—আরেকটি বিজয় না নিয়ে ফিরব না। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি—মা বেঁচে থাকতে আর ফিরিনি, এমনকি মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও না। বিজয় যে অর্জিত হলো না, আমি কোন মুখে তার কাছে ফিরি! আজ ফিরেছি বটে, কিন্তু একে ফেরা বলে না। মা নেই, বাড়িটাও পদ্মায় ভেঙে নিয়ে গেছে—যেখানে আমার মা-বাবা চিরদিনের জন্য ঘুমিয়েছিল। এ-ও একদিক থেকে ভালোই হয়েছে—পরাজিত মুখে অন্তত তাদের কবরের পাশেও দাঁড়াবার কোনো সুযোগ আর রইল না। নিজের কাছে যে প্রতিজ্ঞা, সেটা কখনো ভাঙতে নেই; আমি ভাঙিনি, যদিও পরাজিত হয়েই ফিরেছি। এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো ছিল, মরতে চেয়েছিও অনেকবার। হয়নি। মৃত্যু কেন যেন আসি-আসি করেও আসেনি আর। কেবল বয়স বেড়েছে আর বয়সের ভারে ক্লান্ত সৈনিক যেমন অবসর নেয়, আমিও তেমন অবসরে এসেছি—বিপন্ন, অবসন্ন। খানিকটা বিভ্রান্তও বটে। কিন্তু বিশ্বাস করি—এখনো যুদ্ধ শেষ হয়নি, যুদ্ধ কখনো শেষ হওয়ার বিষয় নয়! একবার যে যুদ্ধে যায়, অন্তত মন থেকে যে যায়, সে কখনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরে না, ফিরতে পারে না, আমৃত্যু যুদ্ধ করে যাওয়াটাই তার নিয়তি। আর যদি ফেরেই, তাহলে তার পরাজয় ঘটে যায়, যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজিতরা মাঠ খালি পেয়ে দখল করে নেয়। আমি অন্তত তেমনটিই মনে করি। মনে করি তেমনটিই ঘটছে এই দেশে, এই কালে। এসব কথা কি কাউকে বলা যায়? কেউ কি বুঝবে এসব কথা? মনে হয় না। তারচেয়ে বরং চুপ করে থাকাই ভালো। অবশ্য বলেও কোনো লাভ নেই—কেউ কারও কথা বোঝে না। নইলে যাদের জন্য এতকাল ধরে কাজ করে এসেছি, যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছি, তাদেরকে কেন আমাদের কথা বোঝাতে পারিনি, কেন তাদেরকে আমাদের দলে টানতে পারিনি? নাকি কোথাও কোনো ভুল ছিল? বোঝার ভুল, জানার ভুল কিংবা বুঝিয়ে বলার ভুল? আদতেই কি চেষ্টা করেছি কাউকে বুঝিয়ে বলতে? এসব প্রশ্ন আজকাল খুব মনে জাগে। শুধু আজকাল নয়, কয়েক বছর আগে থেকেই জাগছিল। উত্তর পাইনি। কে-ই বা উত্তর দেবে, উত্তর দেবার মতো যারা ছিলেন, সবাই নিহত অথবা বিচ্যুত কিংবা প্রত্যাখ্যাত। এখন তো আমারই উত্তর দেবার বয়স, প্রশ্ন করার বয়স নয়। নতুন যারা আসে, তাদেরও অনেক প্রশ্ন থাকে। কিন্তু আমি নিজেই যেসব প্রশ্ন সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি, সেগুলোর উত্তর কীভাবে দেব? এই ভুলের চিন্তাই আমাকে ফিরিয়ে আনল, নইলে হয়তো ফেরা হতো না। মনে হলো, এভাবে কিছু হয় না। এইভাবে পালিয়ে বেড়িয়ে, রাতের অন্ধকারে দু-চারজন লোককে মেরে বিপ্লব হয় না; বিপ্লবের জন্য জনগণের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সঙ্গে তারা নেই। আরেকটা কথাও মনে হচ্ছিল—আমার যাওয়াটা ছিল আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যাওয়া, আমি ওই পথকেই তখন জনগণের মুক্তির পথ বলে বিশ্বাস করে গিয়েছিলাম। আমার একটা দায়বদ্ধতা ছিল, আমার সামনে তখন আদর্শ হয়ে ছিলেন চারু মজুমদার আর সিরাজ সিকদার। আর এখন যারা আসে...!
এই সব ভাবি এখন এই অখণ্ড অবসরে একা বসে বসে, আর তো কিছু করার নেই। সময় কাটানোই এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছুই ভালো লাগে না, কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না, কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না, আমার যাওয়ার কোনো জায়গাও নেই অবশ্য। বইটই পড়তে বা সিনেমা-নাটক দেখতেও ইচ্ছে করে না, বসে বসে তাই এই সব ছাইভস্ম লিখি। জানি এগুলো কারও কোনো কাজেই লাগবে না, কাজে লাগার জন্য লিখিও না। আমি এক পরাজিত সৈনিক—পরাজিতদের কথা পৃথিবীর কেউ জানতে চায় না।