এখন অনেক রাত্রি। শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা। নগরীর কিনারায় সমুদ্র নিথর হয়ে এসেছে। গম্ভীর হয়ে রয়েছে জাহাজ ও কালপুরুষ।
দার্শনিক মহোদয় একটু অন্যধরনের। তিনি কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। কোনো দার্শনিক বক্তৃতাও তিনি করেন না। জনসমাজে তাঁকে কেউ কোনোদিন দ্যাখেনি। কদাচিৎ তিনি গৃহের বাইরে পদার্পণ করেন। দু-একটি উচ্চারণ তিনি করেছেন, দু-একটি কথা তিনি বলেছেন কারো কারো সঙ্গে। তাতেই রাষ্ট্র হয়ে গেছে তিনি একজন দার্শনিক।
এখন বাইরে জ্যোৎস্নারাত্রি, বাইরে নীলিমা ও নিস্তব্ধতা। কিন্তু প্রকৃতি দার্শনিককে একতিল আকর্ষণ করে না। ঘরের ভিতরে একটি প্ৰদীপ প্রজ্জ্বলিত। তিনি স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন একটি কেদারায়। চোখ বুজে ধ্যানস্থ হয়ে আছেন। এরকমভাবেই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটে ।
এমন সময় বহিৰ্দ্ধারে দ্রুত করশব্দ শুনে চকিত হয়ে উঠলেন তিনি। দাসদাসীরা নিদ্রাগত। এত রাত্রে কষ্ট করে উঠবে তারা? ভেবে তিনি অগ্রসর হয়ে এসে দুয়ার অবারিত করে দিলেন। আর, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে প্রায় ঠেলে এক সুন্দরী কক্ষের ভিতরে চলে এল ।
দার্শনিক একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—কে তুমি? কি হয়েছে?
সুন্দরীর আননে ও শরীরে তখনো ত্ৰাসের চিহ্ন। বলল—আমি এ পথ দিয়ে একটি যানে গৃহে ফিরছিলাম। এমন সময় কয়েকজন দূৰ্বত্ত আমাকে আক্রমণ করে। তাই আমি দ্রুত যান থেকে অবতরণ করে পালিয়ে এসেছি আপনার আশ্ৰয়ে। আমার নাম চঞ্চলা। আপনি আমাকে বাঁচান।
দার্শনিক চঞ্চলার পোশাকের দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। আস্বচ্ছ পোশাকে চঞ্চলার শরীর প্রায় দৃশ্যমান। এই পোশাকে এত রাত্রে কি কেউ বাইরে বেরোয়?—দার্শনিক ভাবলেন। আর চঞ্চলা ভাবল, এই তো, এই তো তিনি ঐশ্বৰ্য প্রায় সম্পূর্ণই তাঁর কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আরো ঐশ্বর্যের। এই তো, এই তো আমার দখলে, প্রস্ফুটিত পুষ্পে ভ্রমরের মতো তার চোখ লগ্ন হয়ে আছে আমার শরীরে। দার্শনিকের বাড়ির সম্মুখের রাস্তার ওপারে পানশালায় কবি-দার্শনিক-চিত্রকর-বাণী-বণিকেরা অপেক্ষমান। সুরাপান করতে করতে তারা জল্পনা-কল্পনা করছে, কোন পরিণাম অপেক্ষা করে আছে তার। বিজয়িনী চঞ্চলা হয়তো একটু পরেই তাদের জানাবে, নগরীতে আর একটি পুরুষও নেই যে নয় তার রূপে মুগ্ধ, লোভাতুর ও নিমজ্জিত।
স্বচ্ছ বসনটিও একটানে খুলে ফেলল চঞ্চলা। তারপর আমূল নগ্নিকা চঞ্চলা নিজেকেও উন্মোচিত করল। সৌরভের মতো নিম্নক্রান্ত হলো তার কণ্ঠস্বর-দার্শনিক মহোদয়, আপনি আমাকে চেনেন না। আমি চঞ্চলা—এই নগরের বাররমণীদের শ্রেষ্ঠা। আমার কটাক্ষপাতে শিহরিত হয় না এমন পুরুষ নেই এই নগরে, আমি তাদের স্বপ্নকল্পনালোকের রানি। এমন জ্যোৎস্না ও আনন্দময় রজনীতে আপনি কেন, একাকী, বিমর্ষ ও চিন্তামগ্ন?—বলতে বলতে দার্শনিককে লঘু আলিঙ্গন করল চঞ্চলা।
দার্শনিক একখণ্ড শীতল নিস্তাপ রক্তহীন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
একটু পরে ছিটকে বেরিয়ে এল চঞ্চলা। দলিত ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো চীৎকার করে উঠল—আপনি আমাকে অপমান করছেন, আমার সৌন্দর্যকে অপমান করছেন। এই নগরে এমন কোনো পুরুষ নেই যে আমার আলিঙ্গনের প্রত্যুত্তরে আপনার মতো অনড় ও নিস্তাপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। আপনি কেন জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত রাখবেন নিজেকে? কেন শরীরের আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকবেন? আমি কি আপনার যোগ্য নই? আপনি কেন আমাকে অপমান করবেন?
তখনো দার্শনিকের দৃষ্টি চঞ্চলার আমূল নগ্ন শরীরে নিপতিত। দার্শনিকের দৃষ্টি দেখে চঞ্চলার এই প্রথম নিজেকে মনে হলো নগ্ন। কিন্তু দার্শনিক তো তাকিয়ে আছেন। শুধু, তাঁর শরীর তো সাড়া দিচ্ছে না, আর তাঁর কণ্ঠে কেন বাক্যশূন্য?
চঞ্চলা আবার উষ্ণ আলিঙ্গন করল দার্শনিককে। কাতর কণ্ঠে অনুনয় করল—আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না, দার্শনিক। বন্ধুদের কাছে আমার সম্মান তাহলে ধুলোয় লুটোবে। দয়া করুন। আপনি, দয়া করে দয়া করুন। আমি নারী আমাকে গ্ৰহণ ধন্য করুন। করে আপনি কি পাষাণ? ধিক আপনার মনুষ্যজন্মে! ধিক আপনার পুরুষজন্মে!
দার্শনিক চঞ্চলার কঠিন আলিঙ্গন ছাড়িয়ে সরে দাঁড়ালেন। তাঁর কঠোর কণ্ঠ যথাসাধ্য বিনীত করে বললেন—চঞ্চলা, তুমি অধীর হোয়ো না। নগরের সমস্ত পুরুষই তো তোমার রূপমুগ্ধ, একজনই না হয় থাকল তার বাইরে?
—কেন, কেন তা হবে? আমার সৌন্দর্যের চেয়ে আপনার বিষন্নতা কি বেশি মূল্যবান? আমার কি কোনো নিজস্ব সাধ-আহলাদ নেই? আমাকে কি আপনি অন্য সব অশিক্ষিতা রুচিহীনা বাররমণীদের তুল্য জ্ঞান করেন? আমাকে কি আপনি মনে করছেন সাধারণ রূপজীবিনী? জানেন, আমার প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে আছে এই শহরের শ্রেষ্ঠ গুণীরা-কবি, ভাস্কর, চিত্রকর, গায়ক, বাদক, বাগ্মী প্রমুখ। শুধু আপনি আমাকে তুচ্ছ জ্ঞান করলেন। ছি-ছি! বৃথাই আমার নারীজন্ম! —যেন হাহাকার করে উঠল। চঞ্চলা ।
—না। তোমার দোষ নেই। দোষ আমার! কিন্তু আমি কি করব, চঞ্চলা? আমি তোমার অসামান্য সুন্দর শরীরের ভিতরের কঙ্কাল যে দেখতে পাচ্ছি। আমি কি করব? আমি কি করব? আমি নিরুপায়।
দার্শনিকের কম্পিত কণ্ঠস্বর শুনে তাকাল চঞ্চলা। দেখল, দার্শনিকের চোখ অশ্রুসজল৷৷
(১৯৮২)