চঞ্চলার গৃহ আজ আবার উৎসবে উতল হয়ে উঠেছে। দণ্ডমুক্তির উৎসব। যেখানে তার অবধারিত মৃত্যু হতে যাচ্ছিল, সে যে জীবিত ফিরে এসেছে, এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! বাগ্মীর অদ্ভুত প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে চঞ্চলা সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। বসন নির্মোচনের পর চঞ্চলার আমূল নগ্ন শরীর দেখে বিচারকবৃন্দের বিস্ময়ের অবধি ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায়, অলৌকিক শরীরের মহিমা দেখে বিচারকবৃন্দ প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন, তারপরই যেন একটি রুদ্ধ প্রস্তর ঠেলে সরিয়ে উচ্ছ্বসিত বেরিয়ে এসেছিল প্ৰশংসার প্রবল স্রোতোধারা। বিচারকবৃন্দ বিমুগ্ধ বিস্ময়ে একবাক্যে বলেছেন, এ শরীরকে কোনো পাপ স্পর্শ করতে পারে না, এ ঈশ্বরের আশীৰ্বাদ, এ দেবীর সাক্ষাৎ মর্তরূপ। যে-ঈশ্বর এই শরীর সৃষ্টি করেছেন, তার কাছেও কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। এ এক নিসর্গপ্রতিমা, স্বয়ং ঈশ্বরী। নগরের সর্বত্র—সমস্ত গৃহে, বিপণিতে, ময়দানে, পথচতুরে, কুঞ্জে পানশালায়, বিনোদন-কেন্দ্রগুলোতে আজ আলোচ্য কেবল একটি অলৌকিক নগ্ন নারীশরীর, একটি মানুষী, চঞ্চলা। নগরময় চঞ্চলার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল হওয়ার সংবাদ রাষ্ট্র হয়েছে, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রূপকথার মতো একটি ঘটনা। চঞ্চলা হয়ে উঠেছে রূপকথার কেশবতী কন্যা, চন্দ্ৰমালা-মানিকমালার মতো এক স্বপ্নসম্ভব নায়িকা। চঞ্চলাকে যারা দ্যাখেনি, তাদের আগ্ৰহ অসীম স্পর্শ করেছে। চঞ্চলাকে যারা দেখেছে, তারা নিজেদের মনে করছে ভাগ্যবান। সমস্ত নগরবাসীর মধ্যে একটি পুলকের ডানা ও সিরাপ প্রবাহিত হচ্ছে। এই সুযোগে চরিতার্থ হচ্ছে বাগ্মীরও ভূমিকা। তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ত্বের প্রশংসায় লোকে পঞ্চমুখ ।
স্বতন্ত্র একটি গাৰ্হস্থ্য উৎসবের মতো অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হচ্ছে আজ চঞ্চলার গৃহে। চঞ্চলার নির্বাচিত অতিঘনিষ্ঠ ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে। প্রথমে মনে হয়েছিল, চঞ্চলা-ঘটিত এই সমস্যার পরে খানিকটা সতর্ক হবে না কি তারা? পরে মনে হয়েছে, ভয় কী? স্বয়ং বিচারকবৃন্দই শেষ পর্যন্ত রায় দিয়েছেন চঞ্চলার পক্ষে। সুতরাং নির্বিঘ্নে আনন্দ উদ্যাপিত হোক।
চঞ্চলার গৃহে হলেও আজকের অনুষ্ঠানের আয়োজক এই নগরের একজন বিখ্যাত বণিক—তিনি চঞ্চলার করুণাধন্য। আজই প্ৰাচ্য থেকে বিচিত্ৰবিধ বিরল ও মহার্ঘ জিনিশপত্ৰ সমেত তাঁর একটি জাহাজ এসে ভিড়েছে নগরপ্রান্তস্থ সমুদ্রে। আনন্দিত তিনি এই উৎসবের আয়োজন করেছেন। চঞ্চলার ছোট্ট সুন্দর ভবনের প্রতিটি কক্ষ আজ বিচিত্ৰবৰ্ণ আলোকমালা ও পুষ্পসজ্জায় দীপ্যমান। কক্ষে কক্ষে সুরভি, সংগীত, সুরা, আলোক, পুষ্প ও আনন্দধ্বনির তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে। গৃহস্বামিনীর এই আনন্দ উৎসবে দাসদাসীরাও শরিক হওয়ার জন্যে সজ্জিত হয়েছে চারু সাজপোষাকে।
ভবনের বৃহৎ কক্ষে আজ সমবেত হয়েছে চঞ্চলার অতি ঘনিষ্ঠেরা—বাগ্মী, ভাস্কর, চিত্রকর, কবি, নাট্যকার, গায়ক, বাদক প্রমুখ। বাগ্মীর অভিনব কৌশল প্রয়োগের প্রশংসা হচ্ছে। তিনিও সবিস্তারে জানাচ্ছেন, কী অবস্থায় কীভাবে তিনি ঐ কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন, এবং বিচারকবৃন্দের দৃষ্টি ও প্রতিক্রিয়ার অনুসূক্ষ্ম বিবরণ। চঞ্চলার কাছে পূর্বাহ্নে বাগ্মী তাঁর কূট অভিপ্ৰায় ব্যক্ত করেননি, কেবল তাকে কোনো অন্তর্বাস না-পরে আসতে বলেছিলেন—যাতে একটানে পোশাক খুলে ফেলে তাকে নগ্ন করে ফেলা যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় চঞ্চলাও হতচকিত হয়ে পড়েছিল, এবং তার লজ্জাকরুণ মুখ লুকিয়েছিল দু’হাতের পাতার আড়ালে। হয়তো লজ্জাই তার শরীরের গুরুভার, ক্ষীণতা ও বঙ্কিমায় এমন লাবণ্য সঞ্চার করেছিল যাতে অভিভূত হয়েছিলেন বিচারকবৃন্দ। আজ এখানেও, চঞ্চলার ভবনে তার রূপের স্তুতি চলছে। বাররমণীদের মধ্যে চঞ্চলা যে শ্রেষ্ঠা এবং তুলনাহীনা, তা কি প্রমাণিত হয়নি? বৃথাই গৃহবধূদের ঈর্ষা, বৃথাই অন্য অন্য বাররমণীদের দগ্ধ হওয়া, প্রেমপ্রত্যাখ্যাত রাজপুরুষের ক্রোধও ব্যর্থ হলো। এক-পর্যায়ে অভিযোগকারী রাজপুরুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ হাসি-মশকরার অজস্র বাণ বর্ষিত হয় ।
বিজয়িনী চঞ্চলার জন্যে প্ৰত্যেকেই তার ব্যক্তিগত প্ৰীতির অর্ঘ্য নিয়ে এসেছে। বেচারা তরুণ গায়ক প্রতিজ্ঞা করেছিল যে চঞ্চলার গৃহে আর কখনো আসবে না। কিন্তু এরকম আনন্দ-উৎসবের দিনে কি না এসে পারা যায়? সে একগুচ্ছ দুর্লভ জাতের গোলাপ নিয়ে এসেছে। চঞ্চলার জন্যে কবি আজই কোন ফাঁকে যেন রচনা করেছে একটি চন্দ্রকরোজ্জ্বল কবিতা। সমবেত হর্ষধ্বনির মধ্যে কবি তার কবিতাটি মন্দ্ৰকণ্ঠে পাঠ করে শোনায়। সকলের মন স্পর্শ করে, সকলের আনন্দ যেন কবিকণ্ঠে উচ্চারণ খুঁজে পেয়েছে। ভাস্কর ঘোষণা করে, সমস্ত কর্ম বাদ দিয়ে সে যতদিন লাগে চঞ্চলার এই অসাধারণ শরীর-সম্পদের একটি অনুকল্প রচনা করবে। শরীরের মৃত্যু তো একদিন হবেই, জরা ও বার্ধক্য তো একদিন শরীরকে আক্রমণ করবেই, কিন্তু এই শরীরের একটি ছাঁচ চিরকালের মানুষের আনন্দ বর্ধনের জন্যে রেখে যাওয়া চাই। তারপর সুললিত কণ্ঠে চঞ্চলা একটি সংগীত নিবেদন করে—সেই সংগীতের মর্ম শুধু আনন্দ, আনন্দ, আনন্দনিষ্যন্দিত আকাশ। আর যতক্ষণ গান চলতে থাকে, ততক্ষণে চিত্রকর চঞ্চলার একটি গীতরত ছবি অংকন করে চলে, এবং গীত সমাপ্ত হলে সেটি সমর্পণ করে চঞ্চলাকে। চঞ্চলা সবাইকে দেখায় ছবিটি। সবিস্ময়ে সকলে দ্যাখে, চিত্রে অবিকল রূপায়িত হয়েছে সংগীতরত চঞ্চলার মুখশ্ৰী ও দেহভঙ্গিমা। তারপর সকলের অনুরোধে, কবি যতক্ষণ না তাকে অনুরোধ করে ততক্ষণ অপেক্ষা করছিল, তরুণ গায়ক গান করে। তার কণ্ঠস্বর গভীর ও সুশ্রাব্য। তারপর চঞ্চলা একটি নৃত্য পরিবেশন করে—এই নৃত্যের বিষয় খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া একটি পাখির ফুরফুরে প্রমুক্তি ও আনন্দ। বাগ্মী তখন অসম্ভব সরস কয়েকটি গল্প পরিবেশন করে—সকলের হাস্যারোল রাত্রির সুনীল আকাশে রঙিন ফানুশের মতো উড়ে যেতে থাকে। রাত্রি যত অধিক হতে থাকে নগরের কোলাহল যত নির্বাপিত হতে থাকে, ততই এই গৃহের আনন্দ যেন হতে থাকে বর্ধিত। সব শেষে, আজকের অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক বণিকশ্রেষ্ঠের প্রস্তাবে, এবং সকলের সানন্দ সমর্থনে, চঞ্চলা একটি সম্পূর্ণ বিবসন নৃত্য পরিবেশন করে। সকলের প্রস্তাব ও অনুরোধকেও ছাড়িয়ে যায় চঞ্চলার নিজস্ব বুদ্ধিমতী যোজনা—বিবসন হয়ে সে উপস্থিত হয় ঠিকই, কিন্তু সালংকারা। তার মস্তকে, কৰ্ণে, কণ্ঠে, বাহুতে হস্তে, কটিতে, জঘনে, পায়ে অলংকাররাশি স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ, তারপরই তার বাহুর বিক্ষেপে, জঘনের আন্দোলনে, পদক্ষেপের দ্রুততালে যেন কক্ষের ভিতরে স্বর্গের হিল্লোল একের পর এক স্পন্দিত হয়ে যায়। চঞ্চলার শরীর হয়ে ওঠে একটি সংগীত, সেই নৃত্যে কাম যেন স্বয়ং প্রমূর্ত হয়ে পাঁচটি ইন্দ্ৰিয়ের একটি ইন্দ্ৰধনু জ্বেলে দ্যায়।
নৃত্যশেষে দ্রুত ভিতরে অন্তৰ্হিত হয় চঞ্চলা। এবং অনেকক্ষণ ফেরে না। চঞ্চলার প্রস্থানের পরেও কিছুক্ষণ সবার কাটে নির্বাক এবং রুদ্ধশ্বাস। তারপরই আবার শুরু হয় বাক্যালাপ৷
কবি কেবল কাব্যলোকেই অধিষ্ঠান করে না, দেখা যায় তার মাথাও খেলে অচিন্তনীয় সব দিকে দিকে। হঠাৎ সে বলে-আচ্ছা, আজ তো সমস্ত নগর একটি আলোচনাতেই শুধু মুখরিত-চঞ্চলার। আমরা এখানে যারা সম্যকভাবে উপস্থিত তারা তো বটেই, এমনকি মহান বিচারকবৃন্দ, এমনকি সাধারণ নগরবাসী পর্যন্ত সবাই চঞ্চলাতে মুগ্ধ, নিবেদিত, সর্বসমর্পিত। এখন বলুন তো দেখি, এই নগরেই এমন কে আছে, যাকে এসব আনন্দ ও উত্তেজনা কিছুমাত্র স্পর্শ করছে না? যিনি আজ বিচারসভাতেও যাননি, আসেননি। এখানেও, এবং চঞ্চলার উপস্থিতি যাকে কিছুমাত্র চঞ্চল করে না, এমন কে আছেন?
জানা ছিল সকলেরই, কিন্তু প্ৰসঙ্গটা কেউ ভেবেই দ্যাখেনি, এখন প্রসঙ্গ তোলা মাত্র তার কথা মনে পড়ল। তাছাড়া কবির বাক্যের যেন একটি নিটোল ধাঁধার অপরূপ সুরাহা করছে এম্নি কলরোল করে বলে উঠল—দার্শনিক!! দার্শনিক মহোদয়!
—ঠিক বলেছেন। কবিও সহৰ্ষে বলে।—এখন বলুন এই যে অরসিক দার্শনিক, একি সেই প্রস্তরের তুল্য নয় যে হাজার বছর ঝর্নাজলে স্নাত হয়েও একফোঁটা রস পেল না?
চিত্রকর বলল—তা তো বটেই।
—বেশ। সোৎসাহে বলে কবি—এখন বলুন, এটা কি অমানবিক নয় যে সমস্ত নগরবাসী চঞ্চলার রূপে নিমজ্জিত হলো, অথচ একজন হলো বঞ্চিত?
—বুঝলাম, বুঝলাম—ভাস্কর অধৈৰ্য । এত ভনিতা না-করে পরিষ্কার করে বলুন তো, কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?
—ঠিক। ঠিক সেখানেই এসে আমি পৌঁছেছি, যেখানে সোজা আমার প্রস্তাবটি পেশ করা যাবে। আমার প্রস্তাব আর কিছু না, একটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই বলছি, আজকের এই অবিস্মরণীয় রাত্ৰেই বেচারা দার্শনিককে জীবনের মধুভাণ্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হোক। অর্থাৎ চঞ্চলা আজ রাত্রেই তাঁর নৈঃশব্দ্য, গাম্ভীৰ্য, কৌমার্য এবং একাকিত্ব ভঙ্গ করবে।
—অসম্ভব। প্রতিবাদ করে উঠল বাগ্মী। —দার্শনিক মহোদয়কে টলানো যাবে না একটুও। তিনি নির্বাকপ্রায় এবং আত্মস্থই থেকে যাবেন। আপনারা কি লক্ষ্য করেননি, এই নগরে কারো সঙ্গে মিল নেই তার? যদিও তিনি এই নগরের অধিবাসী, আমাদের কি মনে হয় না তিনি এই নগরের নন?
—নগরের না হোন, নাগরিকদের হতে দোষ কী। কবি পরিহার করে বলেসেটাই পরীক্ষা হোক রাত্রে। চঞ্চলার বিজয় সম্পূৰ্ণ হোক।।
আর সেই মুহূর্তেই সুবেশিনী চঞ্চলা পুনঃপ্রবেশ করে। কলরব করে ওঠে সবাই। চঞ্চলা বিস্মিত চক্ষে ও কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে—আবার কি হলো? এত হুল্লোড়?
কলরব। হর্ষ। আলোমালা। সুরা। সুরভি।
নগরী প্রায় নীরব হয়ে এসেছে। শুধু এই বাড়িটি থেকে উত্থিত হচ্ছে। কোলাহল। বাইরে, ঈশ্বরের পৃথিবীতে তখন নেমে এসেছে নীল নিস্তব্ধতা ও শ্বেত শান্তি । বাইরে, ঈশ্বরের নীলিমায় মেঘের ভিতর দিয়ে একটি মসৃণ সোনার তরীর মতো চন্দ্র ভেসে চলেছে।