প্রিয় উদয়ভানু

দুই

অমর মিত্র

৬২ বার পঠিত

শুভ্রার কথা সত্য। আসলে বিমলের নিজের কোনো ইচ্ছেই হয় না নিজের লেখা পুরোন বই পুরোন লেখা ঘেঁটে দেখতে। অথচ তার বন্ধু লেখকরা কেউ কেউ তা করে থাকেন। সংস্কার করেন দশ বছর আগের লেখার। বইয়ের নতুন এডিশনে তা যুক্ত বা বিযুক্ত করেন। বন্ধু সহকর্মীরা পুরোন অফিসে ঘুরে ঘুরে যান। গল্প করে আসেন। বিমলকে ডাক দেন, এসো বিমল, একবার ঘুরে যাও, দেখাসাক্ষাৎ হোক। বিমলের সব টান সরে গেছে। সে শুভ্রাকে বলে, আমার যেন মনেই পড়ে না, আমি ওখানে চাকরি করতাম, এত বছরের সম্পর্ক যেন ধুয়ে মুছে দিয়ে এসেছি। বিমল সরকার ভুলেই গেছে সে একটি চাকরি করত। তার অনেক সহকর্মী ছিল। তাদের কারোর কারোর সঙ্গে তার সখ্যতা ছিল।

সহকর্মীদের কেউ কেউ রি-এমপ্লয়মেন্ট নিয়েছে, আবার কাজে ঢুকেছে। যে পোস্টে কাজ করত সেই পোস্টে না থেকে তার চেয়ে নিচু পোস্টেও ঢুকেছে। সারাজীবন অফিসে কাটিয়েছে, সুতরাং অফিস ছাড়া থাকে কী করে? কিন্তু বিমল সরকারের মনের ভিতরে যেমন আছে গ্রহণের আকুলতা, তেমনি আছে নিঃশব্দ বর্জন। ধীরে ধীরে তার মন থেকে কী করে যে সব পুরাতন সরে যায়। নতুন এসে সেই জায়গাটি অধিকার করে। বিমল তবুও যেতে চেয়েছিল সেই গোবিন্দপুর। মন বলছিল একবার দেখে আসে কেমন বাড়ি করে গেছেন ক্ষীরোদ রায়?

শুভ্রা বলল, তুমি তো অনেক সময় পেয়েছ, মন দিয়ে লেখ।

হা হা করে বিমল হেসেছে, আগে কি মন দিতাম না।

না অফিস গিয়ে সারাজীবন কত সময় নষ্ট করেছ বলো।

বিমল চুপ করে থাকে। জানে না কত হাজার ঘন্টা নষ্ট হয়েছে অফিসে। চাকরি না করলে হত না। জীবনের আরম্ভে সে লিখে তো পয়সা পায়নি, বরং লিখতে এসে পয়সা খরচ করেছে নিজের পকেট থেকে। তাই চাকরি, আর চাকরির পরে নিশ্চিন্তে লেখা, বিয়ে করা। জীবন অতিবাহিত করা। একেবারে নিরাপদ জীবনে বসে বিমল লিখেছে। যদি সেই গোবিন্দপুরে গিয়ে বাড়ি বানাত তাহলে হয় তো জীবনের নিরাপত্তা কিছুটা বিঘ্নিত হতো। সেই যে ধু ধু মাঠ, মাঠের ভিতর পাথর বসিয়ে বসিয়ে আলাদা করে দেওয়া টুকরো টুকরো জমি, সেই জমির একখন্ড তার। মহা পৃথিবীর এক বিন্দু অংশ তার নিজের। পরে মনে হয়েছে ওই সব আবেগের কোনো মানে নেই। পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের পৃথিবীর জমির উপর কোনো অধিকার নেই। তার বাবা কাকারা যে দেশভাগের পর এপারে এসে সমস্তজীবন অন্যের বাড়িতে ভাড়াটে হয়ে থেকে গেলেন খোদ কলকাতা শহরে থাকার অভিপ্রায়ে। তাঁদের মনে কি খেদ ছিল কোনো? আর বাগান করা? বিমলের মনে পড়ে তার ঘরটির জানালায় টবের ভিতরে বাবা গোলাপ রজনী গন্ধা ফোটাতেন। তখন বিমল খুব ছোট। বাবার মনে কি ইচ্ছা ছিল শূন্যে পুকুর কাটা আর মাছ ছাড়া ! তাদের ঘরে ছিল একটি অ্যাকোরিয়াম। তার ভিতরে রঙিন মাছেরা ঘোরা ফেরা করত। সে বসে থাকত অ্যাকোরিয়ামের সামনে হাঁটু মুড়ে। মা বলত। তখন তার বছর তিন। বাবা নাকি বলত, প্রকৃতির একটু চিহ্ন এইসব---টবে ফুল ফোটান, রঙিন মাছ পোষা আর খাঁচার ভিতর বিলিতি পাখি লাভ বার্ড। বিমল বলে, তার তো লেখা আছে, তার আর কিছু চাই না। তার অতো সময় নেই। সারাজীবন ঘুরেছে অনেক।

এহেন বিমল সরকার একদিন চিঠি পেল মুরশিদাবাদের এক গ্রাম মিঠিপুর থেকে কোনো এক শাওনি চন্দের কাছ থেকে। চিঠির যুগ তো ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগের কত নতুন মাধ্যম হয়েছে। গত দশ পনের বছরে বদলে গেছে যোগাযোগের সকল উপায়। এখন ই-মেল, ফেসবুক, ব্লগ, টুইটারের দিন। এ ব্যতীত মোবাইল ফোন রয়েছে। লুকোনর কোনো উপায় নেই। বিজন বনে গিয়ে লুকোলেও অপরাধীকে ধরিয়ে দেবে মোবাইলের টাওয়ার। কিন্তু মিঠিপুরের শাওনি লিখেছে খামে পুরে এক দীর্ঘ চিঠি। আর সেই চিঠির ভিতরে একটি সবুজ পাতা। চিঠির শেষে রঙের পোঁচ। চিঠিটি এমন,

প্রিয় লেখক

প্রিয় উদয়ভানু,

আমি শাওনি, আমি এবার এম, এ,তে ভর্তি হয়েছি গৌড় বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তোমার লেখা অনেক পড়েছি। হ্যাঁ, সত্যিই অনেক। তোমার উপন্যাসের চরিত্রের নামে তোমায় সম্বোধন করলাম উদয়ভানু। সেই যে প্রাচীন গৌড়, পাল রাজত্বের শুরু। মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটছে ধীরে ধীরে, দূর প্রাগ জ্যোতিষপুর থেকে আসছে দরিদ্র ভাগ্য অন্বেষী কৃষকপুত্র উদয়ভানু, সেই যে শাল প্রাংশু দেহ, মস্ত বুক, মস্ত উরু, মাথাভরা ঘনচুল, তামাটে বর্ণের পুরুষ, আমি তার মতোই যেন তোমাকে দেখি। আমি চাই কোনো এক পুরুষ সে হোক উদয়ভানুর মতো, আমার প্রিয় লেখক বিমল সরকার যেমন কল্পনা করেছেন, তেমনি পুরুষ সত্য হোক আমার জীবনে....।

পড়তে পড়তে বিমল সরকার অবাক। সে যা নয়, তেমন ভাবেই তো রচনা করেছে উদয়ভানুকে। সে তো পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি, অতি সাধারণ চেহারার এক প্রবীন পুরুষ। এই শাওনি কি দ্যাখেনি বইয়ে ছাপা তার ছবি? সে কি তাকে টেলিভিশনে দ্যাখেনি? এই মেয়েটি নিতান্তই অতি কনিষ্ঠা। তার কন্যার চেয়েও ছোট। তা হোক, তার অনুরাগিনী নিশ্চিত। এ পর্যন্ত কেউ তাকে উদয়ভানু নামে ডাকেনি। ভাল লাগল বিমলের। সে যখন, সেই আঠাশ বছর আগে তার উপন্যাস উদয়ভানু লিখতে আরম্ভ করে, তখন এই মেয়ে জন্মায়নি। যখন এই উপন্যাস গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় তখন এই এই মেয়ে হয়ত মাতৃগর্ভে। এর বয়স কত হতে পারে? ২২ কি ২৩। তার বেশি কিছুতেই নয়। এই বছরই ভর্তি হয়েছে পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাসে। তার উপন্যাসের বয়সও ওই। ২৩ বছর। চিঠি পড়তে লাগল বিমল সরকার,

তুমি ভাবছ, কে এই বেহায়া মেয়ে, এমন কথা কেউ বলতে পারে? মনের কথা মনেই রাখুক না সে। আর তুমি তো আমার অনেক অনেক বড়। কিন্তু লেখকের কি বয়স হয় প্রিয় উদয়ভানু। তুমি আমার থেকে অনেক বড় কেন না তুমি আমার আগে জন্মেছ। আমি তোমার থেকে অনেক বড় হতাম যদি আমি তোমার অনেক আগে জন্মাতাম। কিন্তু কথা তা নয় প্রিয় উদয়ভানু, আমার এই পত্র সম্পূর্ণ অন্য কারণে। আমি জানি প্রতিদিন দূরাভাষে কতজন কত কথা বলে তোমার সঙ্গে। তোমার কাছে মেসেজ যায় কত। মেল যায় ই-মেলে। আমি চিঠি লিখতেই ভালবাসি প্রিয় উদয়ভানু। চিঠি না লিখলে আমার প্রিয় উদয়ভানুর কাছে নিজেকে প্রকাশ করব কীভাবে? শোনো উদয়ভানু, তোমার প্রতিটি বই আমার কাছে আছে। আমার মা কিনতেন, মায়ের খুব প্রিয় লেখক ছিলে তুমি। মা নাকি কোন সে বহুযুগের ওপারে তোমার চেয়ে এক ক্লাস নিচে স্কটিশ চারচ কলেজে পড়ত। তখন তুমি লিখতে আরম্ভ করেছ সবে। কলেজ ম্যাগাজিনে তোমার গল্প ছাপা হয়নি। মা বলত আর হাসত। সে সব ম্যাগাজিন এডিটর কোথায়, কলার তোলা পাঞ্জাবি আর চারমিনার সিগারেট। তুমিও খুব চারমিনার খেতে, প্যাকেটের পর প্যাকেট। লেখকরা অমন নাকি হয়। তোমার মনে পড়ে প্রিয় উদয়ভানু? ...

অবাক হয় বিমল সরকার। সে কি স্কটিশ চারচ কলেজে পড়ত? মনে পড়ে না। হা হা করে হাসতে ইচ্ছে হয় বিমলের। সে পড়ত ঝাড়গ্রাম কলেজে। তার বাবা তখন বদলি হয়ে সেই শালবনে ঢাকা শহরে। শহর নয় যেন, গ্রাম আর শহর মেশান। রেল লাইনের ওপারেই আদিবাসী গ্রাম। কী সুন্দর ছিল সব। মনে পড়ল বিমলের। ভুলেই গিয়েছিল। ভুলে যাওয়া তার অভ্যাস। কিন্তু স্কটিশ চারচ কলেজে সে পড়তে যাবে ভেবেছিল। সেই যে হেদুয়ার পিছনে শান্ত কলেজটি। সেই কলেজে তার বাবা পড়েছিলেন দেশ ভাগের আগেই ওপার থেকে এসে অগিলবি হোস্টেলে থেকে। তার দাদা পড়েছিলেন। সেই কলেজে বিখ্যাতজনেরা সব পড়তেন বিখ্যাত হওয়ার আগে। কিন্তু তার পড়া হয়নি। ওই সময়েই বাবা বদলি হয়ে ঝাড়গ্রাম। তার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। কিন্তু এই যে শাওনি সে লিখেছে তার মা ১৯৭০-এ ভর্তি হন স্কটিশে, সন ঠিক আছে, বিমল সরকার ১৯৬৯-এ ঝাড়গ্রাম কলেজ। কেমিস্ট্রি অনার্স। শাওনির মা তার এক বছরের জুনিয়র ছিলেন ধরা যাচ্ছে। এই অবধি ঠিক আছে। সে যদি স্কটিশে পড়ত সব মিলে যেত। কিন্তু সে ভর্তি হবে এই ভাবে মনে মনে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল এইচ, এস,-এর রেজাল্টের জন্য। কিন্তু এর ভিতরে বাবার বদলি। এই ফ্ল্যাটে দাদা বউদি থাকল, মাকে নিয়ে বাবা ঝাড়গ্রাম। সে গেল। মা তাকে রেখে যাবে না। কিন্তু সেই সময় কি আর একজন বিমল সরকার প্রবেশ করেছিল স্কটিশে? তার জায়গায় আর কেউ বিমল, সে গল্প লিখত, তার গল্প প্রত্যাখ্যান করেছিল কলেজ ম্যাগাজিন। আর ঝাড়্গ্রামের শালবনে মন খারাপ করে ঘুরতে ঘুরতে, তার সহপাঠী শান্তনুর চিঠি পেয়ে, স্কটিশ চারচ কলেজ, তার মস্ত সেমিনার হল, লম্বা সিঁড়ির বর্ণনা পড়তে রাগ হতো। সেই সময় সে প্রথম গল্প লেখে। সেই গল্পে ছিল দুঃখবোধ। কিন্তু সে কোথাও তা ছাপতে দেয়নি।

......প্রিয় উদয়ভানু, মা তোমার সব বই কিনত। মা তোমার প্রথম বই মহাত্মা গান্ধীর দেশও পেয়েছিল কলেজ স্ট্রিট ফুটপথে। ঐ বইয়ের কথা মা জানত না। কোনো বিজ্ঞাপন দ্যাখেনি কোথাও। তোমার কবি আর গল্প লেখক বন্ধুরা বের করেছিল, সেই কথা অনেকদিন পরে তুমি লিখেছিলে কোন এক ছোট ম্যাগাজিনে। তোমার লেখা যে ম্যাগাজিনে বেরত আমার মা তা সংগ্রহ করত। মা তোমার গল্পের একটি বিবলিওগ্রাফি করেছিল। কিন্তু তা সম্পূর্ণ হয়নি। মা যে আচমকা চলে গেল লেখক। প্রিয় উদয়ভানু, মাকে আমি কতবার বলেছি চলো যাই একবার, তোমার কলেজের সেই লাজুক, মুখচোরা যুবকটির সঙ্গে দেখা করে আসি। মা যাবে যাবে করেও শেষ পর্যন্ত যাওয়া হল না, মা চলে গেল, কিন্তু একটা কথা সেই দিন দুপুরে আমাকে বলেছিল গল্প করতে করতে.........।

কী কথা? মা বলেছিল তোমার প্রথম বইয়ে তুমি চমকে দিয়েছিলে। ‘’মহাত্মা গান্ধীর দেশ’’ বইটিতে যে কয়েকটি গল্প ছিল তা ভিতরে যে তেজ ছিল, তা পড়ে মা ভাবতেও পারেনি অমন গল্প সেই লাজুক আর মুখচোরা কেমিস্ট্রি অনার্সের ছেলেটি লিখতে পারে। তুমি কেমিস্ট্রি পড়তে স্কটিশ চার্চে। তোমাদের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ছিলেন অপরেশ ভট্টাচার্য। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল গম্ভীর। মা বলত হে গম্ভীর হে গম্ভীর। তুমিও হে গম্ভীর। এক বছর ড্রপ দিলে, পড়াশুনো করোনি, শুধু খাতা ভর্তি করে গল্প লিখেছ। গম্ভীর হয়ে থাকো। কেমিস্ট্রির পরিবর্তে সাহিত্য পাঠ করো। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যাইয়ের মৃত্যু নিয়ে একটি লেখা লিখেছ। সমস্তদিন তাঁর বাড়ির সামনে বসে ছিলে। লিখেছিলে হিমালয়ের প্রস্থান। মা তোমার সেই খাতা পড়েছিল তোমাদের আর এক সহপাঠীর কাছ থেকে নিয়ে। .........।

বিমল সরকার অবাক হয়ে যাচ্ছিল। কী করে তা হয়? সে খুব ছোট থেকে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেছে। এক পাড়ায় বাড়ি। টালা পার্কের ধারেই। সেই রাস্তার নাম এখন তারাশঙ্কর সরনী। তারাশঙ্করের মৃত্যুর দিনে সে ঝাড়গ্রাম। কিন্তু একটি লেখা তো লিখেছিল খাতায়, তারাশঙ্করের স্মৃতি। হিমালয়ের প্রস্থান নামে লেখাটি সে লিখেছিল তারাশঙ্করের এক জন্মদিনে। তার ভিতরে পুরোন লেখার ছায়া ছিল। রেডিওতে ধারাবিবরনী শুনেছিল বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কন্ঠে। সেই সময় সেই টালা পার্কের আর একটি যুবক, আর এক বিমল সরকার ছিল তারাশঙ্করের বাড়ির বাইরে ঘাসের জমিতে বসে। সারাদিন। সে যা করত তাই করেছিল সে?.........।

কী করে হয়? সেই শাওনি লিখেছে, প্রিয় উদয়ভানু, তোমাকে এই নাম দিয়েছিল আমার মা। যেদিন, এই এই শ্রাবনের সতেরই মা চলে গেল আচমকা। যাবে যে ভাবতে পারিনি আমরা কেউ। বরং আমার বাবার শরীর না জটিলতায় ভরে গেছে। সুগার প্রেশার, তো আছেই, ইদানীং হারটের একটা গোলমাল দেখা দিয়েছে। বাবা বাড়িতে থাকেন। অনেকদিন অবসর নিয়েছেন। মায়ের চাকরি সবে শেষ হলো। মা এইবার তাঁর সহপাঠীর সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলছিল। ঠিক হয়েছিল আমি আর মা যাব। সেদিন ছিল আষাঢ়ের অঝোর ধারা। নিম্ন চাপ এল না, উদয়ভানু, সেই সময়। সারাদুপুর ধরে মা গল্প করেছিল তোমার। স্কটিশ চারচ কলেজের সেই লাজুক গম্ভীর যুবকটির। হে গম্ভীর হে গম্ভীর ! মা মাঝে মাঝেই বলে উঠছিল আর খিলখিল করে হাসছিল। সেই স্কটিশ কলেজ, হেদুয়ার জল, ট্রাম রাস্তার ধারে বসন্ত কেবিন, তুমুল আড্ডা। আবার ট্রাম লাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে হাতিবাগান। সেখানে একটি মিষ্টির দোকান শ্রী গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডার। সেই দোকানে পাওয়া যেত ক্রিম রোল। খুব সুন্দর। একবার রঙমহল থিয়েটারে তোমাদের নাটক দেখিয়েছিল মা। মায়ের এক দাদা হলেন বিখ্যাত অভিনেতা সুন্দর মুখারজি। তোমার কি এখন এসব মনে আছে উদয়ভানু?.........

বিমল সরকার রীতি মতো ধন্ধের ভিতর পড়ে। আশ্চর্য, তার স্বপ্ন ছিল যেন এই সব, সেই স্বপ্নের কথা লিখেছে এই শাওনি। যা ঘটেনি অথচ ঘটতে পারত সেই কথাই যেন লিখেছে এই বছর তেইশের মেয়েটি। আষাঢ়ের ঘনঘোর দুপুরে মা আর মেয়ে গল্প করতে বসেছে খাটের উপর। মায়ের মাথার চুলে অনেকটা রূপোলি ভাব, মেয়ের চুল খোলা, শীর্ণকায় সেই মেয়ে, বড় বড় দুই চোখ, সে জিন্স আর টি শার্ট ভালবাসে। তার মাথায় ঘন মেঘের মতো চুল। মা বলে, তোর মতোই চুল ছিল আমার, উঠে উঠে এই রয়েছে।

যা আছে, তা কি কম মা, তোমার বয়সে এমন চুল থাকে কার?

মা হাসল, মায়ের চোখে বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এল। মায়ের নাম মন্দিরা। তাই কি? ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে এক মন্দিরা ছিল, সে তার খাতা চুরি করে পড়েছিল তার প্রথম গল্প। নাহ, তা কী করে হয়, এ যে স্কটিশ চার্চের কথা বলছে। মা আর মেয়ে গল্প করতে করতে দুপুর পার করে দেয়। মা বলে, বিমল সরকারের সব বই আমার আছে, কিন্তু প্রথম বই, মহাত্মা গান্ধীর দেশটা গেল কোথায়? শাওনি বলে, আছে মা আছে।

খুঁজবি তো।

দেখি তো। বলে মেয়ে ওঠে। দেওয়াল জুড়ে বইয়ের তাক। তার ভিতরে লুকোল নাকি সেই বই? বিমল সরকারের জন্য তো আলাদা তাক। তার সব বই সেখানে পরপর সাজানো। এ বাড়িতে অনেক বই। মায়ের ওই নেশা। আর বই সাজানো ও সুন্দর করে। বিমল সরকারের তাকে তার প্রথম বই নেই। অথচ ছিল। মা তা পেয়ে গিয়েছিল কলেজ স্ট্রিটের ফুটপথে। সেই বইটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য বইয়ের ভিতর লুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। বাবার অত বইয়ের নেশা নেই। মায়ের বইয়ের তাকে হাত দেয় শুধু মেয়ে শাওনি। শাওনিও মা মন্দিরার মতো পরিপাটি। গুছিয়ে রাখে সব কিছু। এই বাড়িটায় লক্ষ্মীশ্রী আছে। মা মেয়ের ভিতরেও তা। দুজনেরই হাসি মুখ? মা মেয়ে দুজনেই খুঁজছে সেই বই। খুঁজে পায়নি। তখন মায়ের কী মন খারাপ।

শোনো উদয়ভানু, সেই আষাঢ়ের দুপুরের পর বিকেল থেকে আমি আর আমার মা সেই বই খুঁজলাম। পাইনি। পরের দুদিনও খোঁজা হলো। পেলাম না। অন্য তাকেও খুঁজলাম, না নেই। বইটা উধাও হয়ে গেছে। প্রত্যেক দিন মা একটু একটু করে বিমর্ষ হতে লাগল। এক দুপুরে আমাকে বলল, গল্পগুলো আবার পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে, ওর ভিতরে নানা অনুভবের গল্প ছিল, প্রথম বই, অল্প বয়সে লেখা, কী এক দীপ্তি ছিল বইটার নানা গল্পে, এখন আর একবার পড়লে ধরা যেত গল্পগুলো টিকে গেল কিনা।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে কী মা, কিসে টিকে যাবে?

ধর চল্লিশ বছর পার হয়ে গেছে, চল্লিশ বছর আগে লেখা সেই গল্প, বাবা আর মেয়ে যাচ্ছে নেমন্তন্ন খেতে কুটুম ঘরে। গাঁয়ের গল্প। কুটুমবাড়িতে মহাভোজ। কুটুম অনেক বড় লোক। মেয়ের ভাত জোটে না প্রায়ই। অভাবী বাপের ক্ষুধার্ত মেয়ে। আসলে বাপ তাকে বিক্রি করে দিতে নিয়ে যাচ্ছে। কতগুলো ক্ষুধার্ত শৃগালের মুখে ছেড়ে দিতে নিয়ে যাচ্ছে। এই রকম বা একটু অন্য রকম গল্প, তা আবার পড়ে মা দেখতে চায় বিমল সরকারের গল্প টিকে গেল কিনা। ‘’মিথ্যে কুটুম’’ ছিল সেই গল্পের নাম। আর সেই মহাত্মা গান্ধীর দেশ! সেই গল্প ছিল ভূমিহীন এক কৃষকের জীবন ও মৃত্যুর গল্প। কী অসামান্য ছিল সেই গল্পের এক মৃত্যু। সারাদিন কাজ করে এসে সন্ধ্যায় আপনা আপনি একা একা লোকটি মারা যায় বাড়ির উঠনে বসে। তোমার লেখা প্রথম সাড়া জাগানো গল্প, মনে পড়ে?