অদ্ভূত এক চিঠি এসে পৌঁছেছে বিমল সরকারের কাছে। এতটা বয়স অবধি কত রকম চিঠি পেয়েছে। পাঠক আর পাঠিকার কাছ থেকে। কিন্তু তা ছিল গত দশ বছর আগে অবধি। গত দশ বছর কালেভদ্রে চিঠি পায়। ফোন পায় বেশি। ফোনে মেসেজ পায়। ই-মেলে পায় প্রতিক্রিয়া। ফেসবুকে তার একটি পেজ আছে। সেখানেও কেউ কেউ লিখে দিয়ে যায় কোনো বই নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া। যোগাযোগের মাধ্যমই বদলে গেছে। কতদিন বাদে একটি চিঠি পেয়েছে বিমল। আর সেই চিঠি তাকে টেনে টেনে পিছনে নিয়ে যাচ্ছে। বিমল সরকার নিজে পিছনে ফিরতে চায় না। একবার লিখে ফেলা লেখা আর পড়ে দ্যাখে না। সে শ্রাবনের দুপুরে চিঠি পড়তে পড়তে নিজেকে আলাদা করে নিতে পারছিল না। কিন্তু বিমল বিযুক্তিতে বিশ্বাস করে। সে জানে ডিটাচড হলে দেখা যায় সম্পূর্ণ করে। কিন্তু এই এক তেইশ বছরের মেয়ের চিঠির কাদামাটিতে সে যেন জড়িয়ে যাচ্ছিল। কোনো পাঠক বা পাঠিকার চিঠি এত নিবিড়ভাবে সে পড়েনি কখনো। এই যে শাওনি লিখেছে,
প্রিয় উদয়ভানু,
মায়ের মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল বইটি না পেয়ে। কে নেবে সেই বই? কোথায় যাবে? মাস দুই আগেও তো যেন ছিল মনে হয়। কে নিল? তোমার সুবৃহৎ নতুন বই যদি কেউ নিয়ে যায়, বিশ্বাস হয়, কিন্তু সেই বইটা কেন নেবে? সেই বই ছাপা ছিল স্মল পাইকা হরফে। আমি জানি না স্মল পাইকা হরফ কাকে বলে। মা একটা ছাপা বই দেখিয়ে বলেছিল, ওইটা। এখন কম্পিউটার প্রিন্টিং-এ ১২ পয়েন্ট হবে। সেই পাইকা, স্মল পাইকা আর লাইনো ফেস টাইপের লেটার প্রেস সেই কবে উঠে গেছে। আমার জন্ম ১৯৯0-এ। তখন আর সেই সব ছাপাখানা নেই। যা একটি দুটি টিমটিম করে বাতি জ্বালিয়ে বসে ছিল সেখানে লিফলেট আর মিষ্টির দোকানের বাক্স ছাপা হত। শেষে তারাও গেল লেটার প্রেস ছেড়ে। মায়ের মুখে শুনেছি, টাইপ কেসের কথা। খোপে খোপে এক একটি সিসের অক্ষর, ক খ গ ঘ......। সেই সিসের অক্ষর পর পর সাজিয়ে এক একটি বাক্য। বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে এক একটি পাতা, এক একটি পাতা এক একটি কাঠের গ্যালিতে। ষোল পাতায় ফরমা। সিসের অক্ষর নিয়ে কাজ করতে করতে বুকে অসুখ ধরে যেত কম্পোজিটরদের। তারা হাতে হাতে অক্ষর সাজাতো। মা সব জানত। মায়ের সব বিষয়ে কৌতুহল ছিল। মানুষের পুরোনর প্রতি এক ধরনের মায়া থাকে। ছেলেবেলা, যৌবনবেলা তার মনে আসন পেতে বসে থাকে। মায়ের তা ছিল। অবসরের পর মা এই সব আমাকে বলে যেত এক এক দুপুরে। উদয়ভানু তোমার সেই বই কদিন ধরে খুঁজে না পেয়ে মা বিমর্ষ হয়ে যেতে লাগল। কলকাতার নানা পুস্তক বিক্রেতার কাছে ফোন করে করে জানতে চাইলো বইট এখন কোন প্রকাশকের ঘরে। তোমার মূল প্রকাশক মেঘদূত প্রকাশনের শ্যামাবাবু জানালেন ওই বই ছাপা নেই। তিনি ফোন নম্বর দিলেন না, ঠিকানাও না। কিন্তু ঠিকানা তো পেয়ে গেলাম ইয়ারবুকে। সেখানে ফোন নম্বর নেই। চিঠি লিখব লিখব করে লেখা হয় না। প্রিয় উদয়ভানু, তারপর শ্রাবনের এক দুপুরে মা আর মেয়ের কথা হল, মা বলল, মা নিজে লিখবে সেই চিঠি, তোমার প্রথম বইটি আমার মা মন্দিরা আবার পড়তে চায়।
শাওনি মুখ টিপে হাসল মায়ের কথা শুনে, বলল, তুমি লেখ আমি স্পিড পোস্টে পাঠিয়ে দি।
মন্দিরা বলে, আমি বলছি, তুই লেখ।
না মা, তুমি নিজে লেখ, তুমি টেবল চেয়ারে গিয়ে বস, সুন্দর প্যাড পেয়েছ তোমার কলিগদের কাছ থেকে, ওই প্যাডে লেখ নীল রঙের কালিতে।
না না, আমার হবে না, তুই লেখ।
বাহরে, আমি কেন লিখতে যাব, তুমি লেখ সেই স্কটিশ, বসন্ত কেবিন, রঙমহল আর এক একদিন কফি হাউস।
মায়ের মুখে রক্তচ্ছটা দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল যেন। মা বলল, লিখব দেখি। কী বিমর্ষ সেই কণ্ঠস্বর। মা বিন বিন করে বলল, আমি কি পারব, পারব না, তুই দেখে দিস, আমি একটা খসড়া করছি।
যাহ, তা হয় নাকি, তোমার চিঠি আমি পড়ব কেন?
মন্দিরা তখন বলল, আসলে আমি দেখে নিতে চাই বিমলের সেই গল্পগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক কিনা, এত বছর বাদে সেই আগের অনুভূতি নিয়ে আসে কিনা, গল্প থেকে আমি নতুন কোনো মাত্রা খুঁজে পাই কিনা, তা যদি না হয় আমি খুব দুঃখ পাব।
শাওনি বলল, বইটির কপি একটা চেয়ে নাও।
মন্দিরা বলল, দ্যাখ, চাইব তো নিশ্চয়ই, কিন্তু তারপর যদি আমি দুঃখ পাই, বইটি কোথায় গেল, আমি মাস দুই কেন, মাসখানেক আগেও দেখেছি, বইটি কি আর ধরা দিতে চায় না, আবার তাকে পড়া হোক তা চায় না লেখক বা বই নিজে।
তুমি কী বলছ মা?
বাইরে তখন মেঘ ডাকল গুরুগুরু। সেই বহু যুগের ওপার হতে মেঘ এল। প্রায় চল্লিশ বছর আগে থেকে, তারও আগে থেকে তারও আগে থেকে যাত্রা করেছিল যে মেঘ, সে এল। মন্দিরা বলে, আমার মনে হয়, বইটি আত্মগোপন করেছে নিজে নিজে।
কী বলছ মা? শাওনি শিহরিত হয়।
হ্যাঁ, আর ধরা দিতে চায় না। মন্দিরা বিনবিন করে বলে।
তোমার তাই মনে হচ্ছে?
হ্যাঁরে হ্যাঁ।
তুমি চিঠিতে লেখ তা তোমার উদয়ভানুকে।
মায়ের ষাটোত্তীরণ চোখে কী একটা দ্যুতি জেগে উঠে মিলিয়ে গেল। প্রিয় উদয়ভানু, মায়ের কাছ থেকে এই নামটা আমি পেয়েছি তোমার। সেই রাত ছিল শেষ রাত, সকালে উঠে দেখি মা আমার পাশে নেই। আমি শুয়ে পড়ার সময় মাকে রেখে এসেছিলাম আমার স্টাডিতে। মা কোনোদিন আমার কাছে এসে শোয়, কোনোদিন বাবার পাশে। বাবা এমনি চুপচাপ মানুষ। খেলা পাগল। সারাদিন টেলিভিশনে খেলা দেখে সময় কাটিয়ে দেন। আমার কী যে মনে হল, আমি উঠেই স্টাডিতে গেছি, মা তো কাল রাতে আমার কাছে এসে শোবে বলেছিল, আমাদের একটা গল্প হয় ভোরে। সুখে আমরা মা আর মেয়ে গল্প করি তখন। মা তার ছেলেবেলার কলকাতার কথা বলে, লাল দোতলা বাস, হাতিবাগানের থিয়েটার, ঠং ঠং করতে করতে ট্রামের যাওয়া আসা, বিডন স্ট্রিটে রবীন্দ্র মেলা, নাটক রাজরক্ত, চাকভাঙা মধু। পুলিশের ভয় ছিল তোমাদের খুব। তোমাকে নাকি একবার থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে জেরা করেছিল।
চমকে যায় বিমল সরকার। হ্যাঁ। ঝাড়্গ্রামে তখন নকশাল আন্দোলন তুঙ্গে। তাদের কলেজেও। পুলিশ অনেক জেরা করে তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। তাদের রাজ কলেজে পোস্টার পড়েছিল বন্দুকের নল শক্তির উৎস। বিমল পিছিয়ে যেতে থাকে শাওনির চিঠিতে চিঠিতে। তার মা সেই প্যাডের পাতায় শুধু লিখেছিল, “ প্রিয় উদয়ভানু’’। মা ঘুমিয়ে ছিল যেন। টেবিলে মাথা। কী প্রশান্তি মায়ের মুখখানিতে। চিরঘুমে গেছে আমার মা মন্দিরা।
(আমার বিনীত প্রার্থনা তুমি যদি পারো, সেই প্রথম বইয়ের একটি কপি আমাকে পাঠিও। তোমার বইএর ভিতর সাজিয়ে রেখে দেব। মা তো সবই সাজিয়ে রেখে গেছে। তার ভিতরে সেইটি থাকবে।)
প্রিয় উদয়ভানু,
আমি উপরের যে বাক্যটি বন্ধনির ভিতরে লিখেছি, তা আমার লেখার কথা ছিল। মায়ের কাছে তেমনই শুনেছিলাম। মা তোমার কাছে সেই প্রথম বইটি চেয়ে নেবে। তোমার কি মনে পড়ে লাল দোতলা বাসের সামনের সিটে বসে পাইকপাড়া থেকে একবার বালিগঞ্জ যাওয়ার কথা। হু হু হাওয়া। তুমি আর আর একটি ছেলে বসেছিলে একটি সিটে, মা আর তোমাদের ক্লাসের মৌমিতা মুখারজী এক সঙ্গে। তখন তো এমনি হতো। যাক ওসব কথা, তুমি বিস্মিত হবে, মা চিঠি না লিখে ঢলে পড়েছিল টেবিলে। কিন্তু তোমার বইটি ছিল আবার সেই বইয়ের তাকে ঠিক জায়গায়। মায়ের ভয়ে সে নিজেকে লুকিয়েছিল অসংখ্য বইয়ের ভিতর। মা চির ঘুমে চলে যেতে সে আবার নিজের জায়গায়। আমার কী হয়েছিল, মাকে ওই অবস্থায় দেখে আমি তাকের দিকে চলে গেছি, কী মনে হয়েছিল যে মনে মনে, সেই বই ফিরে আসবে। এসেছে এসেছে।
লেখক, আমার প্রণাম নিয়ো। আমি আর কী বলব?
শাওনির এইটি প্রথম চিঠি। এই হয়তো মিঠিপুরের মেয়ের শেষ চিঠি। জানি না এই চিঠি তুমি পড়বে কিনা। আমার কথা আমি বললাম। তুমি পিছনে ফিরে দেখবে কিনা জানি না। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম, নাকি আমাকে আমার মা বলেছিল আমাদের প্রিয় উদয়ভানু কখনো পিছনে ফিরে তাকান না। তিনি লিখেছিলেন নাকি বলেছিলেন যা একবার লিখেছেন, তার দিকে ফিরে তাকালে নতুন লেখায় যাওয়া যায় না। নিজের লেখা নিয়ে নিজের মুগ্ধতার কোনো কারণ নেই। প্রিয় উদয়ভানু তুমি তোমার প্রথম বইটির দিকে কি ফিরে তাকাও না?
বিমল সরকার চিঠি নিয়ে বসে আছে। এই চিঠির জবাব কি দিতে পারবে সে? যা ঘটেনি, তাই ঘটিয়েছে এই শাওনি কিংবা তার মা মন্দিরা। স্কটিশ চারচ কলেজ, বসন্ত কেবিন তার হয়নি, কিন্তু ঘটিয়েছে মন্দিরা। এ কে? এ কি সবটাই বানিয়েছে, নাকি এইই সত্য? এই সত্য অন্তরের সত্য। তার বইটি গোপন কুটুরি থেকে বের করে এনে আবার পড়ে প্রশান্ত ঘুমে ডুবে গিয়েছে সেই মন্দিরা। শীর্ণকায়, দীর্ঘতমা, কেশবতী সেই মেয়ে ভালবাসত প্রেমের গল্প। ভালবাসায় পৃথিবী শুদ্ধ হয়। কিন্তু তখন চাকরি পেয়ে সেই মেদিনীপুরের লোয়াদা নামের একটি জায়গায় নেমে কাঁসাই নদী পার হয়ে বহু পথ হেঁটে সে পৌঁছেছিল তার ক্যাম্প অফিসে। গরিব গ্রাম গরিব দেশ। ভালবাসায় পড়েছিল বিমল সরকার। অন্নহীনের দেশের অন্নহীন মানুষের ভালবাসায় পড়েছিল সে। লিখেছিল সেই মিথ্যে কুটুম। মহাত্মা গান্ধীর দেশ। ক্ষুধার্ত নারী পোষা প্রানীটিকে মেরে খাচ্ছে। এর ভিতরে প্রেম আর ভালবাসার হনন ছিল। সেই সব গল্প পত্রিকায় ছাপা হল। কিন্তু বই করবে কে? কেউ না। নতুন লেখকের বই করবে কেন, চলবে না। বিমল সরকার গিয়েছিল এক গ্রামীন ব্যাংকে। দু হাজার ধার নিয়েছিল, সিকিউরিটি তার সার্ভিস। সেই টাকা শোধ করেছিল একশো করে পঁচিশ মাসে। তখন বিমল মাইনে পেত চারশো টাকা। খুব কষ্ট হয়েছিল পঁচিশ মাস। সে ছিল মহাবন্যার বছর, ১৯৭৮। বন্যায় শহর ভেসে গেছে, পথে কোমর জল। বিমল বইয়ের প্যাকেট বুকে চেপে বাড়ি ফিরেছিল। সেই যে সেই বই সেদিন বেরল। বন্ধুরা ছিল সঙ্গে। তারা সবাই এখন দূরে সরে গেছে অভিমানে। বিমল যে পিছনে ফেরে না। বন্ধুরা কেউ নাকি বলে বিমল খুব স্বার্থপর। হয় তো। সেই কথা বলেছিল ক্ষীরোদ রায়ের মেয়েও। কিন্তু পরে তো সেই গোবিন্দপুরে ফিরে আরো গুছিয়ে নিয়েছে সে বাড়ি আর বাগান। যা বিমলের জীবনে হতে পারত, হয়নি। যা বিমলের জীবনে হতে পারত লাল দোতলা বাস, সামনের সিট মন্দিরা রায়। হয়নি। বিমল বহুদিন বাদে সেই বইয়ের কপিটি বের করতে গিয়ে দ্যাখে নেই। নেই। তার ঘর ভর্তি বই, তার ভিতরে কোথায় আছে কে বলবে। নাকি তার কোনও মায়া ছিল না বলে, আর একজনের হাতে চলে গেছে। বাড়ির কত বই একটি কাজের লোক চৈতন্য বেচে দিয়েছিল সের দরে। তার সঙ্গে? বিমল সরকার কেঁপে ওঠে। নাকি বইয়ের স্তুপে কোথায় সে ঘুমিয়ে আছে এত বছর ধরে? সুবৃহৎ উপন্যাসের লেখক বিমলের তা জানার কথা নয়। সে তো পুনর্মুদ্রণ করতে দেয়নি তার যৌবনকালের চিহ্নগুলিকে। কতজন ছাপতে চেয়ে না শুনে গেছে। বিমল বহুদিন বাদে সেই বই, সেই অলীক এক সহপাঠিনী, না পড়া কলেজ স্কটিশ চার্চ, বসন্ত কেবিন, লাল দোতলা বাস আর ক্ষীরোদ রায় ও গোবিন্দপুরের জন্য আকুল হলো।