অনেক দিন পর আলম ফিরে এলে বাড়ির মানুষগুলো তাকে নিয়ে সত্যি সত্যি অস্বস্তিতে ভোগে। কেমন ব্যবহার করবে তার সঙ্গে—উষ্ণ, না শীতল; সমাদর করবে তাকে, নাকি অবহেলা; নাকি নীরব উদাসীনতায় তার আগমনকে একটি স্বাভাবিক ঘটনা বলে প্রমাণ করবে—যেন সবারই জানা ছিল, এমনটিই ঘটবে, এমনই ঘটার কথা, এমনই ঘটে থাকে সব সময়—এসব ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তই তারা নিতে পারে না। এই এত দিন সবাই তাকে প্রায় ভুলেই ছিল, ২০ বছর কম সময় নয় তো! ’৭৩-এ গিয়েছিল আর ফিরে এল এই ’৯৩-এ! একজন মানুষ এত দিন ধরে অনুপস্থিত এবং যোগাযোগবিচ্ছিন্ন থাকলে তার সঙ্গে আর কতটুকু সম্পর্কই বা থাকে! থাকে না বললেই চলে। তাকে নিয়ে কেউ মাথাও ঘামায় না, যেন পরিবারের এক মৃত সদস্য সে, কখনো-কখনো দু-চারটে দীর্ঘশ্বাস তার জন্য বরাদ্দ করা যায়, বড়জোর দু-চার ফোঁটা অশ্রু! কিন্তু হঠাত্ যদি ফিরে আসে সে, দীর্ঘশ্বাস বা অশ্রু তখন আর থাকে না, অভিমান থাকে হয়তো এবং নিশ্চিতভাবেই থাকে অসংখ্য অভিযোগ—কিন্তু সেসব জানাবার মতো ভাষা বা উদ্যম কারোরই থাকে না। কিন্তু এসব ব্যাপারে আলমকে খুব একটা চিন্তিত বলেও মনে হয় না! তার আচরণে আবেগ নেই, উচ্ছ্বাস নেই, নেই বিস্ময় বা কৌতূহল, এমনকি নেই প্রশ্নও, অন্তত সে প্রকাশ্যে কোনো প্রশ্ন আজ পর্যন্ত করেনি—কোনো কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করছে না। তার বিপুল পরিবর্তনটা শুধু দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে সবার, যেন কিছুই আর জানার নেই তার কারও সম্বন্ধে, কিংবা জানাবারও নেই নিজের সম্বন্ধে। আগে—সেটা অবশ্য অনেক দিন আগের কথা—খুব প্রাণবন্ত ছিল সে, একাই বাড়ি মাতিয়ে রাখত! সেই উচ্ছলতা হারিয়ে গেছে সেই কত কাল আগে! যুদ্ধের পর সে যখন ফিরে এল বিজয়ীর বেশে, তখনই বেশ খানিকটা বদলে যাওয়া মানুষ, কী যেন ভাবত একা-একা সারাক্ষণ। তারপর যে কী হলো, কীভাবে যোগাযোগ ঘটল সর্বহারাদের সঙ্গে, কখন তাদের দলে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিল, আর কবে কোনো এক রাতে নিঃশব্দে, কাউকে কিছু না বলে চলে গেল—কেউ তা ঠিকঠাক বলতে পারবে না। তখনো আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধে খুব বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল, তার সাহস আর বীরত্বের গল্প তখন এবং পরেও মানুষের মুখে মুখে ফিরত। তার গল্প-কাহিনী এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, মনে হতো—এ যেন এক রূপকথার রাজপুত্র। শুধু আলমই নয়, মতিনও—বুলুর স্বামী—যোগ দিয়েছিল যুদ্ধে। বুলুর তখন নতুন বিয়ে হয়েছে, কয়েক মাস যেতে না-যেতে যুদ্ধ লাগল। বুলু ফেরানোর চেষ্টা করেছিল মতিনকে, পারেনি। মতিন ফেরেনি আর। মাত্র কয়েক মাসের বিবাহিত জীবন, তবু বুলু স্বামীর মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারল না আর কোনো দিন। ধীরে-ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ল। মাঝে তো অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল, চিত্কার-চেঁচামেচি করত, জিনিসপত্র ভাঙচুর করত, লোকজনকে মারধর করত। এখন সেটা কমেছে বটে, কিন্তু মতিন যে আর ফিরবে না, সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করে না। মতিনের মৃত্যু, বুলুর অসুস্থ হয়ে পড়া আর আলমের সর্বহারা পার্টিতে যোগদান—এ সবই ছিল এই পরিবারের জন্য বিপর্যয়কর ঘটনা। নিম্ন-মধ্যবিত্ত স্কুলশিক্ষক বাবার বড় ছেলে হিসেবে মামুনের ওপর যে অনিবার্য দায়িত্ব পড়েছিল, সে সেটা যথার্থভাবে পালন করার চেষ্টা করছিল। সংসারটাকে যখন অনেকখানিই গুছিয়ে এনেছে সে, তখনই যুদ্ধটা লেগে গেল। মতিন আর আলম যুদ্ধে গেল, তারও যাওয়া উচিত ছিল—সাহসে কুলায়নি। ভাইবোনদের মধ্যে আলম যতখানি সাহসী, সে ততখানিই ভীতু। সে যে যুদ্ধে যায়নি, এ জন্য তখন খুব লজ্জা বোধ হতো, এ জন্য ভয় থাকা সত্ত্বেও মতিন আর আলমকে না করতে পারেনি। যে ভয়টা সে পাচ্ছিল, তাই হলো—মতিন ফিরল না। আলম ফিরল ঠিকই, কিন্তু ভিন্ন মানুষ হয়ে। কেমন নিশ্চুপ আর চিন্তামগ্ন থাকত সব সময়। কে জানত যে ওর মাথায় রাজনীতির পোকা ঢুকেছে! তাও গোপন-নিষিদ্ধ রাজনীতি। ‘তার মাথায় এমন সর্বনাশা রাজনীতির ভূত ঢুকবে কেন? যুদ্ধ লেগেছে, বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিস, ভালো কথা; এবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আয়! পড়াশোনা শেষ করে চাকরি-বাকরির চেষ্টা কর। আর তা ছাড়া, একজন বীর যোদ্ধা হিসেবে তোকে তো সবাই চিনত। একটা চাকরি বা ব্যবসা জুটিয়ে ফেলা তোর জন্য ছিল খুবই সহজ, তা না করে তুই গিয়ে ভিড়লি সিরাজ সিকদারের দলে। আরে! তোকে কি এসব মানায়? বিপ্লব দিয়ে তুই কী করবি? একজন মানুষ তার দেশের জন্য যতটুকু করতে পারে, তুই তোর সাধ্যমতো সেটুকু তো করেছিসই—হার না মানা যুদ্ধ করেছিস, কয়জন মানুষ এই কাজটুকু করতে পারে! এর পরও তোর এত কিসের দায়? কেন তোকেই বিপ্লব করতে হবে?’—না, এসব কথা মামুন কোনো দিন বলেনি তার ভাইকে। এ শুধু তার নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা—তছনছ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের সংসার নিয়ে তার হাহাকারের কথা। মতিনের মৃত্যু, বুলুর অসুস্থতা আর আলমের সর্বহারা দলে যোগ দেওয়া—এই তিনটি ঘটনাই তাদের পরিবার থেকে সমস্ত হাসি-আনন্দ চিরদিনের জন্য কেড়ে নিয়েছে। মা-বাবা এসব শোকেই অকালে মারা গেল। একজন মানুষ কতটুকুই বা সইতে পারে! যে মানুষগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের পরিচয় কেবল বইয়ের পাতায়, তাদের জীবনেই যদি সেটা নেমে আসে, তার পুত্র বা পুত্রসম কেউ যদি সেই যুদ্ধে মারা যায়, যে বিপ্লবের নামই কোনো দিন শোনেনি তারা, তার পুত্র যদি সেই বিপ্লবের নেশায় স্বাভাবিক জীবন ত্যাগ করে, তাহলে এগুলোকে কি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায়?
এই এত দিন পর আলম ফিরে এলে মামুনের একেকবার সবকিছুর হিসাব নিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে হয় বলে—যা যা করেছিস, সবকিছুর চুলচেরা হিসাব তোকে দিতে হবে। আমাকে বোঝাতে হবে, তোর সাফল্য কোথায়? আর যদি ব্যর্থই হবি, তাহলে গেলি কেন? যে অপরাজিত যোদ্ধা ভাইকে নিয়ে আমাদের গর্বের সীমা ছিল না, সে কেন এমন নিশ্চিত পরাজয়ের পথে পা বাড়িয়েছিল? মামুন এসব ভাবে বটে, কিন্তু কিছুই বলে না। আসার পর থেকে সে কোনো কথাই বলেনি আলমের সঙ্গে। আলমও কোনো বিষয় নিয়ে কিছু বলতে আসেনি। না আসাই ভালো। এখন আর কী-ই বা বলার আছে? যে জীবন ব্যর্থতায় ম্লান হয়ে গেছে, সে জীবনের কথা শুনেই বা কী লাভ? সাফল্যের কথা শুনতে ভালো লাগে, ব্যর্থতার কথা নয়।