যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমার সাদামাটা জীবনটাকে পাল্টে দিয়েছিল, মনে হয়েছিল স্বাভাবিক পারিবারিক-সামাজিক জীবন আমার জন্য নয়। এই সংসার-সমাজ, এই গতানুগতিক পারিবারিক জীবন আমাকে তাই বাঁধতে পারেনি। যুদ্ধটা আসলে এমন এক বিষয়, এ শুধু শত্রুর মোকাবেলা নয়, একই সঙ্গে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াও। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যে যোদ্ধারা ভিন্ন মানুষ হয়ে ফেরে, সেটা ওই বোঝাপড়ার জন্যই। আমি একবার বোঝাপড়া করেছিলাম ’৭১-এ, তারপর গত ২০ বছর ধরে।
যুদ্ধের পর থেকেই স্বপ্নভঙ্গ শুরু হয়েছিল, মনে হচ্ছিল—দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে, কিন্তু মানুষের মুক্তি আসেনি; মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ, তার শেষ হয়নি। আর তখনই যোগাযোগ ঘটল সর্বহারাদের সঙ্গে। মনে হলো এটাই আমার পথ—যোগ দিলাম ওদের সঙ্গে; এক রাতে নিঃশব্দে, কাউকে কিছু না বলে চলে গেলাম। তারপর, এই এত দিন পর ফিরে আসা, পরাজিত মানুষের দায় মাথায় নিতে হবে, সেটা জেনেই ফিরে আসা। একজন পরাজিত মানুষের পুরো জীবনটাকেই মনে হয় ভুলে ভরা। আমার গত ২০ বছরের জীবনযাপনকেও সবাই নিছক এক বিরাট ভুল হিসেবে চিহ্নিত করবে, সেটা কি আমি বুঝিনি! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে আমরা জয়ী হওয়া সত্ত্বেও তো এ দেশে অনেক দিন ধরেই বলার চেষ্টা করা হচ্ছে যে যুদ্ধের আগেই আমরা ভালো ছিলাম, মুক্তিযুদ্ধটা ভুল ছিল! যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে যারা জঘন্যতম সব অপরাধ করেছিল, তারা এই দেশে বসে এখন বলার সাহস পাচ্ছে—একাত্তরে তারা কোনো ভুল করেনি। তারা যদি ভুল না করে থাকে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আমরা ভুল করেছিলাম; দুই পক্ষই তো একসঙ্গে সঠিক হতে পারে না! ভুলটা আসলে কাদের ছিল? সারা দেশে যেভাবে ওদের হুংকার-হুমকি শোনা যাচ্ছে, ওদের কর্মকাণ্ড যেভাবে বেড়ে চলেছে, আর সরকারিভাবে ওদের যেভাবে প্রোটেকশন দেওয়া হচ্ছে বহুদিন ধরে, তাতে মনে হয়—হয়তো আমাদেরই ভুল ছিল, নইলে তো এই দেশে ওদের অস্তিত্বই থাকত না। এসব ভাবনা আমাকে আরও চুপ করিয়ে রাখে। অথচ কী আশ্চর্য এক সময় এসেছিল আমাদের জীবনে, ভাবলে আজও শিহরণ জাগে। পুরো জাতিটাই মেতে উঠল যেন এক পাগলা ঘণ্টির আহ্বানে। সারা জীবন ধরে যাদের দেখেছি সাধারণ একেকজন মানুষ হিসেবে, তারাও নিমেষে যোদ্ধা হয়ে উঠল, লাঙল আর কাস্তে ফেলে তুলে নিল বন্দুক। সারা দেশের মানুষ কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেল যোদ্ধাদের পেছনে—সাহস দিলা প্রেরণা দিল, ইতিহাসের বীভত্সতম অত্যাচার সয়েও, অকাতরে প্রাণ দিয়েও তারা জানিয়ে গেল—মুক্তিযোদ্ধারা একা নয়, এ দেশের কোটি-কোটি মানুষ তাদের পাশেই আছে। মনে পড়ে, পঁচিশে মার্চের ক্র্যাকডাউনের সময় আমরা ঢাকায় ছিলাম, তিন দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ঊনত্রিশে মার্চে সবাই মিলে ঢাকা ছাড়লাম। পথে হাজার হাজার মানুষ, সবাই যেন আমাদেরই মতো ঢাকা ছেড়ে পালাচ্ছে, ছুটছে কোনো এক নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে—সবার মুখই দুশ্চিন্তায় ক্লিষ্ট। রাস্তাঘাটে অল্পসংখ্যক যানবাহন, তার প্রতিটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ, চালকদের মুখও যেন ভীতসন্ত্রস্ত, যেন তারাও ঢাকা ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালাতে চায়। বাসে গাদাগাদি ভিড়, ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ লোক মুরগির মতো নিজেদের কোনোমতে সেঁটে দিয়েছে! কোনো দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, যেদিকেই তাকাই, ছড়ানো-ছিটানো লাশ—রাস্তাঘাটে নিতান্ত অবহেলায় কেবল কাক ও কুকুরের খাদ্য হওয়ার জন্য এমন লাশের ছড়াছড়ি আমার মনে চিরদিনের জন্য গেঁথে গেছে। এত দিন আগের সেই দৃশ্যটি এখনো এতটুকু ম্লান হয়নি, চোখ বন্ধ করলে শুধু সেটাই দেখতে পাই। আমার সারা জীবনে দেখা সমস্ত সুন্দর দৃশ্য কেড়ে নিয়েছিল ওই একটিমাত্র করুণ, মর্মান্তিক, বীভত্স দৃশ্য। বাসে যে এত মানুষ, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো উপায়ও নেই, অথচ প্রত্যেকটি লোক চুপচাপ, এমনকি ফিসফাস করেও কেউ কথা বলছিল না, যেন নিঃশ্বাসটাও ছাড়ছিল সাবধানে—এমন ভয়ংকর আতঙ্কে কেউ কোনো দিন ভুগেছে কী না সন্দেহ। এই মানুষগুলোর অপরাধ কী? কী কারণে এমন নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালানো হলো, কেন লক্ষ-কোটি মানুষকে নিরাপত্তাহীন করে তোলা হলো? আমার চোখমুখ শক্ত হয়ে এল—টের পেলাম। মনে হলো—যুদ্ধ যদি শুরু হয়েই যায়, তাহলে আমিও যাব। যা হোক, এক অবর্ণনীয় কষ্টকর পথ পেরিয়ে বাড়িতে পৌঁছলাম রাতের বেলা। আর পৌঁছে শুনলাম এক আশ্চর্য খবর—ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী পঁচিশে মার্চ রাতেই মানিকগঞ্জ থানা আক্রমণ করে ৭০০ রাইফেল লুট করে নিয়ে গেছেন যুদ্ধ করবেন বলে। এখন তিনি যুবকদের সংগঠিত করছেন, হরিরামপুরে আসবেন কালকে, এই উদাসপুর হয়েই যাবেন সেখানে। সারা শরীরে যেন শিহরণ খেলে গেল। মনে হলো, আর কোনো সংশয় নেই—আমিও যুদ্ধে যাব, যাবই। অথচ ওই দিনের আগ পর্যন্ত কখনো ভেবেই দেখিনি যে জীবনে কোনো দিন অস্ত্র হাতে নেওয়ার দরকার হতে পারে। আমি সাহসী ছিলাম বটে, কিন্তু কোনো দিন ঢিল ছুড়ে একটা পাখিও মারিনি, মায়া লাগত বলে। সেই আমার হাতে অস্ত্র, মানুষ মারছি—ভাবা যায়? অবশ্য যুদ্ধের সময় আমি কোনো মানুষ মারিনি, পাকিস্তানি সৈন্যদের মেরেছি, ওদেরকে আমার মানুষ বলে মনেই হতো না। যা হোক, ওই খবরটি শুধু আমাকেই নয়, মানিকগঞ্জের বিপুলসংখ্যক যুবককে উদ্বেল করে তুলেছিল। খবরটা যে পুরোপুরি সত্য নয়, সেটা আমরা জেনেছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। আসলে যে ক্যাপ্টেন হালিম মাত্র সাতটা রাইফেল পেয়েছিলেন, সেটা তখন জানলে এত জোয়ার সৃষ্টি হতো না, এত সাহসও পেত না যুবকেরা। তখন আমরা কতটুকুই বা বুঝতাম? বুঝলে তো এ কথা মনে হতোই যে একটা সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিপুল অস্ত্রসম্ভারের কাছে আমাদের ওই রাইফেল, তা সাতটিই হোক আর ৭০০ হোক—নিতান্তই খেলনা। ভাগ্যিস আমরা যুদ্ধের কিছুই জানতাম না, কিছুই বুঝতাম না; জানলে এমন এক অসম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সাহসই পেতাম না। আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, ক্যাপ্টেন সাহেব তো বুঝতেন-জানতেন, তিনি তো পাকিস্তানের আর্মিরই ক্যাপ্টেন ছিলেন, ওদের শক্তি আর সামর্থ্যও তাঁর অজানা ছিল না, জেনেশুনেও ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নেমে পড়ার সাহস তিনি কোথায় পেয়েছিলেন! এখন বুঝি, ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যতটা না ছিল প্রশিক্ষণ—তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল সাহস, দেশকে মুক্ত করার জেদ, আর দেশের জন্য প্রাণ দেবার আকুতি। একজন মানুষ যখন দেশের জন্য প্রাণ দেবার কথা ভেবেই যুদ্ধে যায়, তখন তার কোনো পিছুটান থাকে না, থাকে বিপজ্জনক-অপরিমেয় সাহস। পাকিস্তানিরা যে হেরে গেল, তার কারণ হয়তো এই যে, ওরা মুক্তিযোদ্ধাদের এই মরণপণ প্রতিজ্ঞার ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেনি। বুঝতে পারেনি, এই দেশের ছেলেরা দেশের জন্য নিজের প্রাণ দেওয়াটাকে একটা তুচ্ছ অথচ গৌরবময় ব্যাপার বলে মনে করে। আর বুঝবেই বা কীভাবে—ওদের মধ্যে তো এর কোনোটাই ছিল না। স্রেফ ভাড়াটে সৈন্যের মতো ওরা এসেছিল এ দেশের মানুষকে শায়েস্তা করার জন্য। সে জন্যই এত লুটপাট, এত খুন, এত ধর্ষণ, এত ধ্বংসযজ্ঞ। এমনকি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার কথা ভাবলেও ওরা এমন নির্মম নিপীড়ন করতে পারত না! আমার ধারণা—ওরা জানত যে এ দেশকে আর পাকিস্তানের সঙ্গে রাখা যাবে না। ওই যে হুংকার ‘দাবায়া রাখবার পারবা না’—এই হুমকিকে ওরা সত্যি বলেই মেনে নিয়েছিল, তাই শেষবারের মতো শাস্তি দেবার জন্য আয়োজন করেছিল এমন বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের। এটাকে যে শুধু পাকিস্তানিরাই সত্যি বলে ধরে নিয়েছিল তা নয়, বাঙালিরাও তাই ভেবেছিল, নইলে সহজ-সরল মানুষগুলো এমন মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারত না। এখন মনে হয়—ওই সাহস, ওই স্বপ্ন আর স্বাধীনতার জন্য ওই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই আমাদের জিতিয়ে দিয়েছিল। নইলে পাকিস্তানিদের অস্ত্রশস্ত্র, লোকবল, ট্রেনিং—এর কোনো কিছুর সঙ্গেই আমাদের পেরে উঠবার কথা ছিল না। আমরা পেরেছিলাম, কিন্তু তবু আমাদের কারও কারও মনে হয়েছিল—মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ, তার শেষ হয়নি। সে জন্যই আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে যাওয়া। কিন্তু এবার পারলাম না। এখন, পরাজিত হয়ে ফিরে আসার পর, আমার মনে হয়—যুদ্ধজয়ের জন্য শুধু সাহস থাকলেই হয় না, স্বপ্নও থাকতে হয়, থাকতে হয় একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও গন্তব্য, আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছবার সম্ভাবনা। এবার যে পারলাম না, তার কারণটা হয়তো এত দিনে বুঝতে পেরেছি আমি।